মাদক-চোরাচালানসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার বাড়ছে

শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস শুধুই আনুষ্ঠানিকতায়

শিশু শ্রম শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী একটি আদি ও জটিল সমস্যা। বিশ্বের নামীদামী অনেক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করে আসছে, তবুও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। একশ্রেণির মুনাফাখোর শিশুদের অল্প মজুরি দিয়ে অধিক মুনাফার আশায় ঝুঁকিপূর্ন কাজে ব্যবহার করছেন। আর শিশুরা অভাবে পড়ে জড়িত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। যেখানে শিশুদের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। বাসের হেলফার, ইট-ভাটায়, কলকারখানা ও নির্মাণ শ্রমিকের মতো অনেক  ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যাপকভাবে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বস্তি এলাকায় মাদক চোরাচালানের সাথে অসাধু লোকজন শিশুদের জড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদেও ব্যবহারের ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। শিশুরা নিউমোনিয়া, কাশি, ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, হাঁপানি, যকৃতের দুরোরোগ্য ব্যাধিসহ নানা রোগ আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

কেস হিস্ট্রি;

মো. রিদোয়ান বয়স ১৩-১৪ বছর। সে লেগুনা গাড়ির হেল্পারের কাজ করছেন। তার সাথে কথা বলে জানান যায়, সে নগরীর কালারপোল এলাকায় একটি বস্তিতে থাকেন। তার পিতা দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ। অসুস্থ হওয়ার আগে গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন তার পিতা। তার মা এখন বাসা বাড়িতে কাজ করেন। রেদোয়ান তার পরিবারের বড় সন্তান। তাই অভাবের সংসারে শিশু বয়স থেকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন পরিবারের বোঝা। সে লেখাপড়া না করলেও তার ছোট বোন ফাতেমা পড়ে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। জীবিকার তাগিদে দুই বছর ধরে করছে হেল্পারের কাজ। সারা দিন কাজ শেষে তিনশ টাকা বেতন পায় রেদোয়ান। যা দিয়ে তার পরিবারে খরচ বহন করে সে। কিন্তু তার বয়সটা এমন যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে কোন অজানা পাপে শিশু বয়সেই তাকে জীবন যুদ্ধে লড়তে হচ্ছে।

নগরীর মুরাদপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরিগুলোতে অবাধে চলছে শিশু শ্রম। এগুলো বর্তমান সময়ে অতি স্বাভাবিক একটি বিষয়। অভাবের সুযোগ নিয়ে অল্প বেতনে শ্রম শোষন করছেন কারখানা মালিকেরা।

ফারুক নামে একজন বলেন, সে প্রায় চার পাঁচ বছর ধরে অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে। প্রথম দিকে একটু কষ্ট হলেও এখন সয়ে গেছে বলে জানায় সে। সে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। বর্তমানে তার বয়স ১৪-১৫ বছর।

এভাবে শহরের আনাচে কানাচে খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছে শিশু শ্রম। কখনও অভাবে, আবার কখনও নিয়তির কারণে শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। হারাচ্ছে শিক্ষার অধিকার, সু স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।

এবিষয়ে বাংলাদেশ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. তৌফিকুল আরিফ বলেন, শিশু শ্রমের উপর বর্তমানে সঠিক কোন পরিসংখ্যান তাদের হাতে নেই। আগামী মাসে প্রকাশিত হতে পারে বিবিএস রিপোর্ট। প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর এই জরিপ হয়ে থাকে। তবে সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩ অনুসারে, দেশে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ১৭ লাখ শিশু শ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য। কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার। আর দুই লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্য রয়েছে। সে লক্ষ্য নিয়ে সরকার অভিভাবক ও কারখানার মালিকদের শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতন করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এবিষয়ে ৩৮টি খাতের মধ্যে ইতিমধ্যে আটটিকে শিশু শ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী জিয়া হাবিব বলেন, শিশু শ্রম সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। শিশুদের যখন স্কুলে যাওয়ার কথা এবং মাঠে খেলাধুলা করার কথা তখন অভাবের কারণে তাদের কাজে যেতে হচ্ছে। শিশুদের শৈশব কৈশোর নিষ্ঠুর ভাবে কেড়ে নিচ্ছে এই শিশু শ্রম। অনেক শিশুকেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন বাসের হেল্পার, কেমিকেল কারখানার শ্রমিক, লেদ মেশিনে কাজ করা, উপকূলের চরাঞ্চলে শুটকি তৈরির কাজ করতে হচ্ছে। যার ফলে অনেক শিশুই শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, মাদক চোরাচালান, বিক্রিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার হচ্ছে শিশুরা। মূলত এক শ্রেণীর মানুষ দারিদ্র জনগোষ্ঠীর অভাব-অনটনকে কাজে লাগিয়ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করছেন বলে জানান তিনি।

জিয়া হাবিব আরো বলেন, এটা সমগ্র জাতি, সমাজ এবং পরিবারের জন্য বেদনাদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক। তিনি সরকার, জন প্রতিনিধি, বেসরকারি সংগঠন, সমাজসেবী, মানবাধিকারকর্মী সহ সকলকে শিশু শ্রমের হাত থেকে শিশুদের মুক্তি দিতে এক যোগে কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কারণ কারো একার পক্ষে এ সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়, তাই সকলকে সচেতনভাবে শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষৎ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

জানা যায়, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, ‘শিশু’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি এবং ‘কিশোর’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে এবং ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুসারে, শিশুদের আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে দেওয়া যাবে না। কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের কাছ থেকে শিশু কিশোরদের সক্ষমতা সনদ নিয়ে শর্ত সাপেক্ষে হালকা কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

দেশে শিশুশ্রম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে দারিদ্র্যতা। বাংলাদেশে এখনও ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। করোনার কারণে আরো ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে পারে। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড

ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে ৮২ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় ৭৯ শতাংশ কমেছে। যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্য বাড়ছে সেখানে দারিদ্র্যতার সংখ্যা বাড়ছে, যার ফলে শিশু শ্রমের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিশুর অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ন শিশু শ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে আন্তজার্তিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে ১২ জুন বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টি দেশে পালিত হচ্ছে এই দিবস।

এমএফ