ভোটে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে

এডিটরস গিল্ডের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার পরামর্শ এসেছে এডিটরস গিল্ড আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা থেকে। আর ভোটে নির্দিষ্ট কোনো দলের অংশগ্রহণের থেকেও দেখার বিষয় হলো, জনগণ ভোট দিতে পারছে কিনা- এমন মতও এসেছে আলোচনা সভায়। একইসঙ্গে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সবাইকে আরো দায়িত্বশীল আচরণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে গতকাল শনিবার ‘নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দেশের সব ধরণের গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু।
আলোচনার সূচনায় তিনি বলেন, এবার নির্বাচনে অর্থনীতি অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। একইসাথে পরাশক্তিরা কী করে, সেদিকেও নজর থাকবে।সবাই চায় নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। সবাই নির্বাচনে আসুক, এই আহবান জানানো হোক।

এর আগে নির্বাচন বর্জনের কারণে দেশের যে অনেক ক্ষতি হয়েছে তা মনে করিয়ে দিয়ে মোজাম্মেল বাবু বলেন, প্রতিষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে আগামীতে যেন নির্বাচনগুলো হয়, সেদিকেই নজর দিতে হবে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকার হলো সবচেয়ে বড় স্টেকহোন্ডার। জনগণের সমর্থন নিয়ে যদি সরকার গঠন করা হয় তাহলে বাইরের দেশগুলোর প্রভাব ফেলার বিষয়টি কমে যাবে। ‘আমরা যেন সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করতে পারি জনগণ যেন ভোট দিতে পারে এই ব্যবস্থা করতে হবে,’ বলেন আলী ইমাম মজুমদার।

তবে নির্দিষ্ট দলের অংশগ্রহণের থেকেও নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারছে কিনা, সেটাই প্রধান বিষয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে কেউ আসলো, নাকি আসলো না, সেটা বড় বিষয় নয়। বিএনপিকে ভাবতে হবে নির্বাচনে অংশ না নিলে জনগণ তার সাথে থাকবে কিনা।’

ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সরকারের দায়িত্ব কিন্তু ক্ষমতায় থাকা। কারণ, সরকার হলো রাজনৈতিক সরকার। এখানে অর্থনীতির কি হলো তা তার দেখার কথা নয়।’ ভোট পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনকে পুরো ক্ষমতা দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান।

তিনি বলেন, সরকার যেন হস্তক্ষেপ না করে। সবার নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। সবার অংশগ্রহণটা নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে আমরা একটা নির্বাচন চাই। এই অধ্যাপক বলেন, ‘সরকারের দায়িত্ব হলো নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয় সেদিকে লক্ষ রাখা, নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ না করা। কারণ, এখানে সরকারের হারানোর কিছু নেই।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যেই বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে। তাই নির্বাচন নিয়ে এতো কথা হচ্ছে। নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে কিভাবে তাদের চিন্তাভাবনায় বাংলাদেশ নির্বাচন করবে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বলেন, আমাদের আগের নির্বাচনের অপবাদে যেন পড়তে না হয় । বড় দলগুলো যদি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে নির্বাচন সঠিক হবে না।

গোলাম রহমান মনে করেন, কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক করতে পারবে না। প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ অবশ্যই দরকার।’জনগণকে ভোট কেন্দ্রে আসার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলো যদি না নেয় তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু করার আশা করা যাবে না।’
বাংলাদেশের ওপর বহির্বিশ্ব থেকে চাপ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, অর্থনীতিতে চাপ আছে যুদ্ধের কারণে।এছাড়া, চাপ আছে বাংলাদেশের ওপর। আমাদের যে পররাষ্ট্রনীতি, তাতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সুফল পেয়েছে। তবে যে চাপ আছে তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ বের করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, যদি নির্বাচন সুষ্ঠ চান, জনগণের অংশগ্রহণ চান, তবে একটা সমাধানে আসতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু বড় দুই দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা আশা করবো শুধু নির্বাচনের দিকে না তাকিয়ে, অর্থনীতির দিকেও মনোযোগী হবে সরকার। নির্বাচনে যত দেরি হবে তত অর্থনীতির উপর চাপ পড়বে।

তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার পরিবেশটা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের পরে অর্থনীতির দিকে নজর দিতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত দুই ভোট প্রমাণ করতে পারেনি যে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়ে হয়েছে। আমাদের ঠিক করতে হবে আসছে নির্বাচন কেমন হবে। নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক না কেনো, সরকার প্রভাব বিস্তার করলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।