আমার একটা মাত্র ছেলে, আমাকে সবসময় বলত, আমি বড় হয়ে একটি বাড়ি বানিয়ে দেব, প্রয়োজনে টিনশেডের বাড়ি বানিয়ে দেব। আমি বলতাম, আব্বু তুমি বড় হও। দুর্ঘটনার পর আমাকে বলেছে, আমি পরীক্ষা দেব না, আমি পরীক্ষা দেব না, আমি পরীক্ষা না দিলে আমার রোল আরও পেছনে চলে যাবে। আমি রোল দশের মধ্যে না থাকলে আমি শেষ। আমার ছেলে শুধু বলত আমি পড়ব। দুর্ঘটনার পর তার শরীরে সুস্থ তেমন জায়গা ছিল না। শুধু ডান হাত, মাথা ও মুখটা কিছুটা সুস্থ ছিল। ছেলে বলত, আম্মু আমাকে মুছে দাও, আম্মু মুখটা মুছে দাও, সকালে যেভাবে মুছে দিছিলা আমার অনেক ভাল লাগছে। আম্মু তোমাকে একটা আপ্পা (চুমু) দি, আম্মু তুমি কান্না করিও না, আমি বাসায় যাব। আমাকে আর কতক্ষণ অ্যাম্বুলেন্সে রাখবা, আমাকে নামাও না, আম্মু আমার বাম পা চলে যাচ্ছে, ব্যথা করতেছে একটু টিপে দাও, কপালটা একটু টিপে দাও। আমার নিষ্পাপ শিশু আরও বলেছে, আম্মু আমার বাবাকে বলিও আমি ভাল আছি, আম্মু তুমি কান্না করিও না, আমি ভাল আছি। দুর্ঘটনার আগে-পরে মাকে বলা কথাগুলো বলতে বলতে কান্না আর বারবার মুর্ছা যাচ্ছে নিহত স্কুলছাত্র আবিরের মা রিপা সুলতানা। এক মাত্র ছেলেকে হারিয়ে তার অবিরত কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিফাত আহনাফ আবির। ১২ বছর বয়সি আবির প্রতিদিনের ন্যায় গত সোমবার বিকালে কোচিংয়ে পড়তে যায়। শিক্ষক আসতে দেরি হওয়ায় শিক্ষকের গতিবিধি দেখতে সহপাঠীদের নিয়ে ওই ভবনের ছাদে উঠে। ভবন ঘেষে ১১ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইনের কাছাকাছি যাওয়ায় হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শরীরের প্রায় ৭০ ভাগ পুড়ে যায়। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া আবিরকে প্রথমে চমেক হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ঘটনার ৪ দিনের মাথায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যায় আবির। এ যেন আর স্কুলে যাওয়া হবে না আবিরের। নিহতের পরিবারের চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের দাবি, মালিকের অবহেলায় এ পর্যন্ত ৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মানুষ খেকো অনিরাপদ এ ভবনটি।
গত সোমবার বিকালে নগরীর বায়েজিদের বালুচড়া এলাকায় লায়লা সুপার মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে এবং বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আবির। সে বায়েজিদ থানাধীন বটতল কুলগাঁও এলাকার সিকান্দর মঞ্জিলের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেনের ছেলে।
নিহত আবিরের বাবা দেশ বর্তমানকে বলেন, আমার একটি মাত্র ছেলে, তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারলাম না, ছেলের শোকে মুহ্যমান বাবা আর বেশী কিছু বলতে পারেননি।
নিহতের মামা মিজানুর রহমান বলেন, আমার ভাগিনা প্রতিদিনের ন্যায় কোচিং করেত যায়, আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে শুনেছি প্রথমে বিকট শব্দ হয়, এক মহিলা রাস্তা থেকে চিৎকার করছে বাচ্চা ঝুলে আছে, পরে দুই তিন মিনিট পরে বাচ্চার নড়া চড়া দেখে এক সিএনজি চালক তাকে ওখান থেকে রক্ষা করে। পরে আমাকে একজন ফোন করে বলে আপনার ভাগিনা পুড়ে গেছে। দৌঁড়ে গিয়ে সিএনজি যোগে ভাগিনাকে প্রথমে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাই, পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে না ফেরার দেশে চলে যায়। আমরা এ রকম আর কোনো অকালে প্রাণ হানি চাই না। এ সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিচার দাবিও করেন তিনি।
আবিরের ছোট চাচা আখতারুজ্জামান নাহিদ বলেন, আমার ভাতিজার দুর্ঘটনাস্থল ভবনটি সরকারী আইন অনুযায়ী নির্মাণ হয়নি বলে আমরা শুনেছি। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে, আমার ভাতিজার মতো আরও প্রাণ যাবে। কেননা এই ভবনটিতে আমার ভাতিজাসহ তিনটি প্রাণ ঝরে গেল।
আবিরের স্বজন মো. আলাউদ্দিন দেশ বর্তমানকে বলেন, ভবন মালিকের অবহেলায় আবিরর মৃত্যু। নিরাপত্তা ছাড়া কিভাবে এত বড় মার্কেট ভাড়া দেন। আইনগতভাবে বিদ্যুত খুঁটির ১৫ ফিট দূরত্ব বজায় রেখে ভবন নির্মাণ করতে হয়। বিদ্যুত বিভাগের সাথে কারসাজি করে অনিরাপদ ভবন নির্মাণ দিনের পর দিন চলছে। ভবনটিতে এ পর্যন্ত তিন জনের প্রাণহানি হয়েছে। ভবন মালিককে অবহেলার জন্য দায়ী করে সংশ্লিষ্টট কর্র্তৃপক্ষের কাছে বিচার দাবী করেন তিনি।
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এভাবে অকালে আমাদের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হারিয়ে যাওয়ায় আমরা শোকাহত। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। শিশু কিশোরদের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আর যাতে আবিরের মতো স্কুলছাত্র দুর্ঘটনায় অকালে হারিয়ে না যায় সে দিকে সবার দৃষ্টি রাখা উচিত।
নিরাপত্তার বিষয়ে লায়লা সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগীর স্বজনদের দাবী মাকেট কর্তৃপক্ষ পলাতক রয়েছে।
এ ব্যাপারে বায়েজিদ বোস্তামি মডেল থানার অফিসার ইনর্চাজ ফেরদৌস জাহান বলেন ‘এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভবন মালিকের অবহেলার বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে’।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে জে বটতলী বায়তুল হামদ হাশেমী শাহী জামে মসজিদে জুমার নামাজে পর জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হয় আবিরের।
দেশ বর্তমান/এআই