চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের যাত্রা শুরুর আনুষ্ঠঅনিক ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। এদিকে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামে পরিচিত ‘মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ে’। যেটি পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তা পার হতে সময় লেগেছে মাত্র ১৫ মিনিট।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এছাড়াও একইসঙ্গে আরও ১৫টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মূল অংশ থেকে ভাটির দিকে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ড্রাইডক ও বোটক্লাবের মাঝে ২৬ একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে এ কনটেইনার টার্মিনাল। ৫৮৪ মিটার লম্বা এ টার্মিনালে তিনটি জেটি আছে। তিনটিতেই একযোগে জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে। দুটিতে আমদানি-রফতানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার জাহাজ এবং ২০৪ মিটার লম্বা অন্য ডলফিন জেটিতে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ প্রবেশ করেছে। কিন্তু পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ প্রবেশের সুযোগ পাবে। নতুন টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষ রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল জানান, বে-টার্মিনালের মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হয়েছে। দেশি-বিদেশি পরামর্শক এবং বিদেশি বিভিন্ন বন্দর কর্তৃপক্ষ ও অংশীদারদের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ডিপিপি ও টেন্ডার কার্যক্রম শেষে আগামী বছরের মে-জুনে এর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমার শেষ প্রান্তে সিইপিজেডের পেছনে সাগরপাড় থেকে সাগরিকায় জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের অদূরে রাসমনিঘাট পর্যন্ত প্রায় ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ৯০০ একর ভূমিতে বে-টার্মিনাল প্রকল্পও আলোর মুখ দেখছে।
এদিকে উদ্বোধনের পরেই ৩ ঘণ্টার জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যান চলাচল শুরু হয়। দ্রুততার সঙ্গে পতেঙ্গা থেকে টাইগারপাস আসতে পেরে খুশি সাধারণ মানুষজন। পুরো কাজ শেষ হলেই শীঘ্রই পুরোপরি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস দেশ বর্তমানকে বলেন, সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী গড়তে বিগত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামকে বিভিন্ন উন্নয়ন উপহার দিয়েছেন। এরমধ্যে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ে সবচেয়ে গুরুত¦পূর্র্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এই এক্সপ্রেসওয়ের এ মাসের মধ্যেই খুলে দেব। আর লালখান বাজার অংশের কাজ আগামী মাসে শেষ করে তারপর উন্মুক্ত করা হবে। আপাতত টাইগার পাস র্যাম্প দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের যোগাযোগ নেটওয়ার্কিংয়ে এক্সপ্রেসওয়ে অন্য একটি মাত্রায় নিয়ে গেলো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ দুটি বড় প্রকল্প ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বিভাগে অন্যান্য যে প্রকল্পগুলো উদ্বোধন করেন তা সেগুলো হলো- নগরীর সিরাজউদ্দৌলা রোড হতে শাহ আমানত ব্রীজ সংযোগ সড়ক (বাকলিয়া এক্সেস) নির্মাণ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এর বহিঃসীমানা দিয়ে সুপ রোজ নির্মাণসহ ঢাকা ট্রাংক রোড হতে বায়েজিদ বোস্তামী রোড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ, লালখান বাজার হতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তজার্তিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদস্থ সিজিএস কলোনীতে জরাজীর্ণ ১১টি ভবনের স্থলে ৯টি বহুতল আবাসিক ভবনে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য ৬৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ, চট্টগ্রাম শহরে পরিত্যক্ত বাড়িতে সরকারি আবাসিক ফ্ল্যাট ও ডরমিটরী ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জেলা সমাজসেবা কমপ্রেক্স নির্মাণ, মহেশখালী জিরো পয়েন্ট (কালাদিয়ার চর)-সিটিএম এস (ধলঘাটপাড়া) গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প, মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প, আনোয়ারা-ফৌজদারহাট গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নে আমান উল্লাহ ভূঁইয়া কমিউনিটি ক্লিনিক (ওয়ার্ড নং-০১) নির্মাণ কাজ (টাইপ-বি), মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এর জন্য গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও কেজিডিসিএল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশন প্রকল্প, নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহের উন্নয়ন, নির্বাচিত বেসরকারি মাদ্রাসা সমূহের উন্নয়ন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ প্রকল্প ও ইউরোপিয়ান সংস্থা, মুজিব কিল্লা নির্মাণ প্রকল্প।
এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যেগে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে মুরালী খালের ওপর ১২১ মিটার দীর্ঘ ভেলালাপাড়া সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।