চট্টগ্রামবাসীর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৬ সালে নগরীর মুরাদপুর বিবিরহাট এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার (ল্যাব)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যাবের জন্য তিনতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে।
খাদ্যের ভেজাল শনাক্ত ও গুণাগুণ নির্ণয়ে এই পরীক্ষাগারে বসানো হয় ১০ কোটি টাকারও বেশি দামের ৮৩টি উন্নত প্রযুক্তির মেশিন। কিন্তু গত ৭ বছর ধরে ল্যাবটির কার্যক্রম চলছে পরীক্ষামূলকভাবে। ৭ বছরে প্রকল্পটির তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়েও জনবলের অভাবে চালু করা যায়নি।এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির কোটি টাকা দামের মেশিনগুলো একের পর এক নষ্ট হচ্ছে।
২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ল্যাবটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা যায়নি। অথচ একই সময়ে এডিবির এই প্রকল্পের অধীনে এমন আরেকটি ল্যাবরেটরি নির্মাণ করা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ঢাকার সেই ল্যাবটি উদ্বোধনের মাধ্যমে চালু করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের ল্যাবটি পড়ে আছে বেহাল দশায়।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে ল্যাবটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়ার পর প্রকল্পের অধীনে একজন পরিচালক, একজন সিনিয়র রসায়নবিদ এবং একজন সিনিয়র মাইক্রোবায়োলজিস্টসহ ২৪ জনকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত বেতন না পাওয়া ও স্থায়ীভাবে নিয়োগ না দেওয়ার কারণে ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যত্র চলে যান। এখন বাকি যে ৮ জন
কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, তারা গত আট-নয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ল্যাবটির প্রায় ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় গত বছরের জুন মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
জানা গেছে, পরীক্ষাগারটির অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ‘স্টার্লিং মাল্টি টেকনোলজি’ নামের ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ২০২১ সালের জুন মাসে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে প্রকল্পটি হস্তান্তর করে।
এর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করেছিল। তারা ল্যাবের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলও পরিশোধ করে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ল্যাবটি এখনো চসিকের কাছে হস্তান্তর করেনি। জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর ল্যাবটি করপোরেশনের আওতায় পরিচালিত হবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ল্যাবটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০১৬ সালে ২৩ পদের বিপরীতে ৩৪ জনের পদ সৃষ্টির জন্য জনবল কাঠামো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বিভিন্ন ধাপ শেষে ১৬ জনকে নিয়োগের অনুমোদন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বাকি পদগুলো আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পূরণের নির্দেশনা দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদনটি প্রেরণ করা হয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো জনবল কাঠামো অনুমোদন দেয়নি।
জানতে চাইলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘এটি দেশের দ্বিতীয় আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার। চট্টগ্রামবাসীর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষে আমরা ল্যাবটি চালু করতে চাই। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি চালু করা যাচ্ছে না। ৭ বছর আগে জনবল কাঠামো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। ১৬ জনের জনবল কাঠামো অনুমোদন দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু জনবল কাঠামোটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে।’
জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার কারণে ২০২১ সালের জুন থেকে ১৪ মাস ল্যাবটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ল্যাবটির অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়। এর আগেও অনেক যন্ত্রপাতি সচল না থাকার কারণে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে তা মেরামত করা হয়। বিল পরিশোধ করার পর এখন বিদ্যুৎ আসলেও ল্যাবটিতে পরীক্ষামূলক কোনো কার্যক্রম চলছে না। বকেয়া বেতন না পাওয়া ও স্থায়ীভাবে নিয়োগ না দেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন কোনো কাজ করছেন না।
জানা গেছে, প্রায় ৮০০ পণ্যের ৭৯ ধরনের টেস্ট করার সক্ষমতা রয়েছে ল্যাবটির। ফলমূল ছাড়া দুধ ও দুধ জাতীয় পণ্য, মিষ্টি জাতীয় পণ্য, জুস জাতীয় পণ্য, কোমল পানীয়, সস, মসলা, বেকারি পণ্য, আটা-ময়দা, মাছ-মাংস, শুঁটকি, সবজি, ভোজ্যতেলসহ আরও অনেক ধরনের খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। এই ল্যাবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০টি পণ্যের টেস্ট করা সম্ভব। নির্ধারিত ফি দিয়ে যে কেউ এখানে খাবারের মান যাচাই করতে পারবেন।
জানতে চাইলে ল্যাবটির চিফ কেমিস্ট মো. ইসমাঈল হোসেন দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ল্যাবটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর থেকে আমরা অনেক পণ্যের মান টেস্ট করেছি। কিন্তু এখন কোনো পরীক্ষা হয় না। ৮ মাস ধরে বেতন পাই না। তাই আমরা এখন আর কোনো কাজ করছি না। ১৪ মাস বিদ্যুৎ না থাকায় ল্যাবটি বন্ধ ছিল। এ সময় কিছু মেশিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এর আগেও জনবলের অভাবে অনেক মেশিন সচল না থাকায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে আবার মেরামত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই ল্যাবের ৯৯ শতাংশ মেশিনই জার্মানির উন্নত প্রযুক্তির, কিছু মেশিন যুক্তরাজ্যের। এমন অত্যাধুনিক একটি ল্যাব ৭ বছর ধরে বেহাল দশায় পড়ে আছে, কেউ দেখার নেই। অথচ ল্যাবটি চালু হলে চট্টগ্রামবাসীর কতই না উপকার হতো।’