যত্রতত্র বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের খোলা সঞ্চালন লাইনের তারে চট্টগ্রামে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি এলাকা যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। জনবহুল এই এলাকার মার্কেট, বাড়ির ছাদ, জানালা বা বেলকনি ঘেঁষে চলে গেছে কয়েক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। পাশাপাশি মার্কেট, বাড়ি নির্মাণ চলছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই। ভবন মালিকদের চরম উদাসীনতায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এলাকার প্রতিটি সড়ক। ফলে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে স্কুল ছাত্র, ভবন মালিকসহ সাধারণ শ্রমিকরা। এছাড়া, গুরুত্বও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড বলছে, তাদের নয়, ভবন মালিকদের অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতায় ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। শুধু গত ৫ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন স্কুল ছাত্রসহ ২ জন এবং গুরুত্ব আহত হন একই পরিবারের আরও ২ জন।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মারা গেছেন শ্রমিক তাজুল ইসলাম। এর আগের দিন সোমবার সকালে তাজুল প্রতিদিনের ন্যায় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদের বালুচড়া আবাসিক এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে লোহাড় রড নিয়ে উপরে ওঠার সময় পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সাথে রড লেগে বিদ্যুতস্পৃষ্টে হয়ে গুরুত্ব আহন হন। আহত তাজুলকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সাজার্রী বিভাগে ভর্তি করা হয়। ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা দেশ বর্তমানকে জানান, শরীরের প্রায় ৬০ ভাগ পুড়ে গেছে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়ার পথে মারা যান তাজুল। তাজুলের মৃত্যুর মাত্র ৫ ঘণ্টার মধ্যে একই এলাকার চাঁদনি সিনেমা হলের পাশে আরাফাত ভবনের তৃতীয় তলায় বৈদ্যুতিক খুঁটির ট্রান্সফরমার থেকে আগুন লেগে গুরুত্বর আহত হন গৃহবধূ নার্গিস (৪০) ও তার মেয়ে ঐশী (১০)। তারা বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মৃত্যুর আগে তাজুল দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আমি লোহার রড নিয়ে উপরে ওঠার সময় বিদ্যুতের তারের সাথে রড লেগে আমার শরীরে আগুন লেগে যায়। অনেকক্ষণ চিৎকার করি বাঁচাও বাঁচাও বলে, এসময় একজন এসে আমার শরীরে আগুন নেভায়, পরে মেডিকেলে নিয়ে আসে।’
নিহত তিন সন্তানের জনক তাজুল ইসলাম (৪৮) নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার আইয়ুবপুর এলাকার তবারাকুল্লার ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীর কাঁঠালবাগান এলাকায় বসবাস করছেন।
এর আগে গত ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিফাত আহনাফ আবির বায়েজিদ এলাকার লায়লা সুপার মার্কেটে কোচিং করতে গিয়ে ভবনের ছাদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুত¦র আহত হন। ঘটনার ৩ দিন পর গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যায়। একই ঘটনাস্থলে বেশ কিছুদিন আগে ওই ভবনের মালিক ইব্রাহিমও বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এর আগেও একই মার্কেটে কাজ করতে গিয়ে এক শ্রমিক বিদ্যুতস্পৃষ্টে মারা যায়। ফলে এই এক ভবনই নিরাপত্তার অভাবে ঝরে গেল ৩ প্রাণ। এদিকে স্কুলছাত্র আবিরের মৃত্যুর ৫ দিন না যেতেই আবারও একই ঘটনায় প্রাণ গেল শ্রমিকের।
গতকাল বুধবার বিকালে নিহত তাজুলের বোন রওশন আক্তার মৃত্যুর বিষয়টি দেশ বর্তমানকে নিশ্চিত করে বলেন, আমার ভাইকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে কুমিল্লা এলাকায় মারা যান। পরে বায়েজিদের বটতলী এলাকার একটি কবরস্থানে মঙ্গলবার রাতে দাফন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার ভাই মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকা চেয়েছি, তারা (ভবন মালিক পক্ষ) পরে জানাবেন বলছেন। যদিও একই ফোন নম্বরে এর দুই ঘণ্টা আগে তাজুল বেঁচে আছেন এবং ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন বলে দাবি করেন অন্য একজন। ভবন মালিক কুতুবুল আবেদিনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার কোনো মন্তব্য নেওয়া যায়নি।
গত সোমবার ঘটনার দিন নিহত তাজুলের মেয়ে বৃষ্টি দেশ বর্তমানকে বলেন, আমার বাবা একজন শ্রমিক, শরীরে আগুন লেগে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আমার বাবার চিকিৎসায় সবাই এগিয়ে আসুন।
এভাবে দুর্ঘটনা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়ে মানবাধিকার কর্মী মো. আলাউদ্দিন দেশ বর্তমানকে বলেন, আবিরের মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষ কঠোর হলে শ্রমিক তাজুলের হয়তো এভাবে মরতে হতো না। আর কত প্রাণ গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে জানি না, তবে দ্রুত এসব ভবন মালিকদের অবহেলার বিচার না হলে আরও প্রাণ ঝরতে পারে। আমরা চাই, বায়েজিদে অপরিকল্পিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং বৈদ্যুতিক তারে আর কোন প্রাণ না ঝরুক।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গত ৫ দিনের মধ্যে দুইটি প্রাণ ঝরে যাওয়া দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে স্থানীয় কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবু দেশ বর্তমানকে বলেন, ভবন মালিকের অবহেলায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। আমি বিষয়টি চট্টগ্রাম ক্যান্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছি, আশা করি বোর্ড কর্তৃপক্ষ ভবন মালিকের গাফেলতি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
ক্যান্ট বোর্ড চট্টগ্রামের প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, ভবনের অনুমতি এবং দুর্ঘটনা বিষয় নিয়ে বোর্ড কাজ করছে। অনুমতি ব্যতিরেখে ভবনে অনিরাপদ কোনো কর্মকাণ্ড সম্পাদন হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
দুই ঘটনায় ভবন মালিকের অবহেলাকে দায়ী করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম দেশ বর্তমানকে বলেন, আমি দুই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখানে আমার বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো দায় নেই। সর্বশেষ ঘটনাস্থলে দেখলাম নির্মাণাধীন ভবন নিচের থেকে উপরের চিত্র ভিন্ন। এটা নিয়ে আমার স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের সর্তক করে চিঠি দিয়েছেন, তাতে কর্ণপাত না করায় এই দুর্ঘটনা। আমাদের ওই এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিষয়টি ক্যান্ট বোডর্কে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছি। এর আগের ঘটনাস্থল লায়লা সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাচ্ছি না, শুনেছি তারা পলাতক রয়েছেন। তাদের পেলে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান বিদ্যুৎ বিভাগের এই কর্তা।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে তাজুলের মৃত্যুর খবরটি বায়েজিদ থানা পুলিশকে জানায়নি নিহতের পরিবার এবং ভবন মালিক পক্ষের কেউ। অভিযোগ আসলে এবং ভবন মালিকের কোনো গাফিলতি থাকলে তা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান বায়েজিদ থানার অফিসার ইনচার্জ ফেরদৌস হাসান।
দেশ বর্তমান/এআই