বিদেশে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা

আইন আছে।  জেল-জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধানও আছে।  তারপরও থেমে নেই অর্থপাচার।  মামলার তদন্তে বিলম্ব ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় অর্থপাচারকারীরা জেল জরিমানার তোয়াক্কাই করেন না। ফলে সুইজারল্যান্ডের (সুইস) ব্যাংক সহ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে।  অর্থপাচারকে একটি বিশেষ ধরণের অপরাধ উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত মামলাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অর্থপাচারকারীরা অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় মামলাগুলোর বিচারেও তারা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে।  এছাড়া যখন কোনো উপায়ন্তর না পায় হাইকোর্টে গিয়ে বিচারকার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ নেয়।  ফলে বছরের পর বছর আটকে থাকে এসব মামলা।

অর্থপাচার সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন হয় ২০০২ সালে।  পরবর্তীতে অর্থাৎ ২০১২ সালে সরকার এ আইনকে আধুনিকায়ন করে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ নামে এটি পরিচিত।  এই আইনের ৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং বা মানি লন্ডারিং অপরাধ সংগঠনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বছর এবং অনধিক ১২ (বার) বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত হইবেন এবং  ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন।’

আইনের ১৭(১) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তি বা সত্ত¡া মানি লন্ডারিং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইলে আদালত অপরাধের সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত দেশে বা দেশের বাহিরে অবস্থিত যে কোনো সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।’

অর্থপাচার, স্থানান্তর, ও রূপান্তরকে ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে ২০১২ সালে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন’ আধুনিকায়নের পর ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর সরকার এটিকে সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের করে।  এতে দুদকসহ মোট পাঁচটি সংস্থা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়।  সংশোধিত আইনে দায়িত্ব পাওয়া অন্য চারটি সংস্থা হলো অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।  প্রশাসন ও সরকারি কোনো সংস্থাকে মামলার বিষয়ে সহায়তা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’।  এরপর থেকে পাঁচটি তদন্ত সংস্থা অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের ও তদন্ত করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ বছরে মানি লন্ডারিংয়ের মোট মামলা হয়েছে ৭৫২ টি।  এর মধ্যে দুদক ৪২৯ টি, সিআইডি ১৭০ টি, শুল্ক গোয়েন্দা ১৫০ টি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৩ টি মামলা করেছে।  এর মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ৩৯৭ টির। আর তদন্ত চলছে ৩৫৫ মামলার।  ২২১ টির তদন্ত ২ থেকে ১২ বছর ধরে ঝুলে আছে।  চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ১০ টির।  এর মধ্যে এ পর্যন্ত বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৬ টির।  ৪৪ টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে।

এদিকে বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত ১১৯ টি মামলায় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।  এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দুবাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া,  সুইজারল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে বলে সূত্র উল্লেখ করেছে।

বিদেশে অর্থ পাচার মামলার তদন্তের অগ্রগতিও খারাপ।  তদন্তের সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র আদালতে হাজির করতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।  এজন্য তদন্ত কর্মকর্তাদেও অদক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এতগুলো সংস্থা থাকার পরও বাস্তবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা নেই।  এতে মানি লন্ডারিং করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন জড়িত ব্যক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, হাইকোর্টের আদেশে এ সংক্রান্ত ৫২ টি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত আছে।  আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে প্রায় ২০ টি মামলা।  উচ্চ আদালতেও মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা প্রায় ২০ টির মতো।

জানা গেছে, কর ফাঁকি দিয়ে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, আইন অমান্য করে দেশের টাকা বিদেশে পাচার ও অবৈধ আয়ের টাকায় বৈধ ক্ষমতার মালিক হওয়া প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পানামা পেপার্স শিরোনামে বিশ্বজুড়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।  দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ও আইসিআইজের ওয়েব সাইটে বর্ণিত দেশ ভিত্তিক তালিকা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে প্রথম পর্বে ৪৩ ব্যক্তি ও দুটি প্রতিষ্ঠান এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৮ ব্যক্তি ও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সহ ৬১ ব্যক্তি এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।  এছাড়া প্যারাডাইস পেপারর্স নামে অর্থপাচারসংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদের প্রথম পর্বে ১০ জন এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৯ জনের নাম পাওয়া যায়।  তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার এবং দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তারা রয়েছেন।  টাকা পাচারের গন্তব্যস্থল দেশগুলো হচ্ছে- সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং এবং থাইল্যান্ড।  আর পাচার চলছে মুলত বানিজ্য কারসাজি ও হুন্ডির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, গত সাড়ে তিন  থেকে চার বছরে অর্থপাচার সংক্রান্ত ৬০ থেকে ৭০ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়ে গেছে।  এর মধ্যে ৪০ শতাংশের মতো মামলা ট্রায়েলে আছে।  বিচারিক আদালতেও অনেক মামলা বিচারের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।  কিছু মামলা বিচারের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে।  মামলাগুলো টাকার অংকে ধরা হলে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

দুদকের এই আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ২০১২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন আইন কেবল ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত (সরকারি কর্মচারি সংশ্লিষ্ট) অর্থ পাচারের অভিযোগ দুদক কর্তৃক অনুসন্ধানযোগ্য।  ফলে সুইস ব্যাংক সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য তথ্য আদান প্রদান সহ একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে বিভিন্ন দেশ অনুসৃত কৌশল পর্যালোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে একটি কর্মকৌশল প্রনয়নের জন্য বিএফআইইউকে অনুরোধ করা হয়েছে।  বিএফআইইউ সেই আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং আইনের ‘প্রেডিকেট’ অপরাধের মধ্যে শুধু ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে দুদক কাজ করছে। ওই অভিযোগ দুদকের তফসিল বর্হিভূত বলে অনুসন্ধান কাজে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না।  তাই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধনের জন্য দুদক সরকাকে প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানান তিনি।