বিদেশি মিশন কি ব্যর্থ

আগামী নির্বাচন ঘিরে বড় দুই দলের বিপরীত মুখী অবস্থান নিয়ে দেশের মানুষ চিন্তিত। দুই দল এক জায়গায় না আসলে পরিস্থিতি কি হতে পারে মানুষ এখন তাই ভাবছে। নানা আশঙ্কাও ভর করছে মানুষের মনে। কারণ ইইউ ও মার্কিন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দুটো প্রতিনিধি দল কয়েকদিন ধরে দুই দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে ইতিবাচক কিছুই দেখাতে পারে নি। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন গন্তব্যে যাচ্ছে কেউ বলতেও পারছে না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আশা করছিলেন, কূটনৈতিকরা দুই দলকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে যাবেন। যেখানে আগামী নির্বাচন নিয়ে পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে একটি সঠিক দিক দেখাবেন জাতিকে। কিন্তু তারা কি ব্যর্থ হয়েছেন এ মন্তব্যও কেউ কেউ করছেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে গত শনিবার ইইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বৈঠকে বসলে আওয়ামী লীগ নেতারা বর্তমান সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হবে বলে জানিয়েছে। অপর দিকে বিএনপি প্রতিনিধিরা বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, এ সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না।

তবে ইইউ বা মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়ার পক্ষে কোন কথা বলেননি। তবে সফরকারি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ডোনাল্ড লু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অংশ গ্রহন মুলক নির্বাচন দেখতে চায়। রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে সংলাপ চায় তবে তারা কোন হস্তক্ষেপ করবে না। বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরিন।

এদিকে গতকাল ইইউ প্রতিনিধি দল নাগরিকের জন্য সুশাসন (সুজন )এর সাথে বৈঠক করেছে। বৈঠক থেকে বেরিয়ে জনগণের স্বার্থে সব দলকে ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর আহবান জানিয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বড় রাজনৈতিক দলের অনড় অবস্থান দেশকে বিপদে নিয়ে যাবে এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। তবে এটি জানাইনি। সুষ্ঠু ভোটের জন্য ইইউর প্রতিনিধিদের সহযোগিতা চেয়েছি।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এমন কথা জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই বিষয়টি ইইউ প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে। তাদেরকে এটাও বলেছি সঠিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে গেলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

তিনি জানান, বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে কোন আলোচনা হয়নি। তবে, নির্বাচন নিয়ে সুজনের অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে ইইউ প্রতিনিধি দল। সঠিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে গেলে বর্তমান ব্যবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবিরের সাথেও গতকাল রোববার বৈঠক করে ইইউ প্রতিনিধি দল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ড. মাহফুজ কবির বলেন, “তারা বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আমি বলেছি, এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত। নির্বাচনের আগ দিয়ে ইইউ’র একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠানো উচিত।”

এদিকে আওয়ামী লীগ বিএনপির বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল গণফোরামের সভাপতি খ্যাতিমান আইনজ্ঞ ও দেশের সংবিধান রচিয়তা ড. কামাল হোসন গত শনিবার দলের বিশেষ সভায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার স্বার্থে অবিলম্বে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সংবিধানে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তার ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করতে চায়। অথচ জনগণের এই মৌলিক ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজ সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

দলের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় কামাল হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মহান স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ¦ সংঘাত ও অবিশ্বাস আজ মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে বিপন্ন করে তুলছে।’

কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘সরকারের সীমাহীন দমন–পীড়নের ফলে দেশ আজ চরম সংকটে। ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো আমাদের গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে। যার ফলে জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত।’

গত ১২ জুলাই রাজধানীতে আওয়ামী লীগও বিএনপি কাছাকাছি দূরত্বে থেকে দুইটি বিশাল সমাবেশ করেছে। কিন্তু সমাবেশ হয়েছে শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সমাবেশের আগে জনমনে আতঙ্ক ছিল দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে কেন সংঘাত সংঘর্ঘ হয় কি না। জানা গেছে, বিদেশি কূটনৈতিকদের চাপ ছিল দুই দলের প্রতি। যে কারনে কেউ কোন প্রকার সংঘাতে জড়ায়নি। আগামী ১৮ ও ১৯ জুলাই আবারও মুখোমুখি হবে দুই দল রাজধানীতে। দুই দলই একই রকম কর্মসূচী দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ বলেছে, আমরা শান্তি শোভাযাত্রা করব। কেউ যাতে কর্মসূচীর নামে কোন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে না পারে। তার জন্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জনগনের পাশে থাকার জন্য শান্তি শোভা যাত্রা।

এদিকে গতকাল এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির তথাকথিত আন্দোলন হলো যেনতেনভাবে ক্ষমতা দখলের আন্দোলন। এ আন্দোলনে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তথাকথিত আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস ও সহিংসতার মাধ্যমে তারা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। বিএনপির আন্দোলন মানে জাতীয় সম্পদ নষ্ট করা ও অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে মানুষ হত্যা করা। যারা জনগণকে শত্রু জ্ঞান করে তারা কখনো জনগণের আস্থা পায় না। বিদেশি প্রভুদের ওপর ভর করে তারা যে আন্দোলন করছে তাতে জনগণের মুক্তি তো মিলবেই না, বরং দেশকে দুর্বল করবে। বিদেশিদের আপন করতে গিয়ে দেশের জনগণকে প্রতিপক্ষ বানিয়েছে বিএনপি।

ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের আইন-আদালতের ওপর সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এমনকি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে এবং অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে, কারাবরণ করেছে। সরকারের হস্তক্ষেপ থাকলে এমন হয় না। বিএনপি ভাড়াটিয়া সাইবার সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে অপপ্রচারের অপকৌশল আরও তীব্রতর করছে। বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চর্চা করে আসছে। তারা সত্যকে যেমন ভয় পায় তেমন দেশের জনগণ এবং সংবিধান ও আইন-আদালতকে ভয় পায়।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘দেশ নাকি ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে’! আসলে বিএনপির রাজনীতিই আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। তাদের মিথ্যাচারের ফাঁপা বেলুন ইতোমধ্যে চুপসে যেতে শুরু করেছে। তারা সরকার বিরোধিতার নামে দেশবিরোধিতায় লিপ্ত। তারা চায় শুধু ক্ষমতা! তারা ক্ষমতা চায় কিন্তু নির্বাচনে ভয় পায়। তাই তারা অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অপর দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনের আর নির্বাচন হবে না দাবি করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের সামনে আর পথ খোলা নেই। কোন দেশের ভিসা নীতিতে কী আছে, না আছে, দেখতে চাই না। জনগণের শক্তিতে আন্দোলন করছি।’ জনগনকে সাথে নিয়ে এ সরকারের পতন ঘটাব। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হতে হবে। তত্ত্বাবধয়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির সাথে যুগপত আন্দোলনে থাকা দল গুলো যেমন বিএনপির সুরে কথা বলছে তেমনি সরকারের সমর্থক অন্যান্য দলগুলোও বর্তমান সরকারের সমর্থনে নানা কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছে রাজপথে।

এমএইচএফ