এক বছর আগে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ড ও বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় প্রশাসন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত করা হয়। তদন্তে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছিলো।কিন্তু পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের দায়মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
ঘটনায় দায়ের করা মামলার অভিযোগ থেকে আট আসামীর অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ খানের আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলে আদালত সেটি গ্রহণের আদেশ দেন। আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি উত্থাপিত না হলে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে কোনো বাধা থাকবে না আসামীদের। প্রশ্ন হলো, আসামীরা যদি অব্যাহতি পেয়ে যায়, তাহলে অর্ধ শতাধিক প্রাণহানির দায় কার?
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, যেসব বিষয়কে আমলে নিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করেছে, পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সেসব গাফিলতিকে পাশ কাটিয়ে দায়মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি অন্যান্য সংস্থার তদন্ত রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে বিএম ডিপোতে ভয়াবহ
বিস্ফোরণে ৫১ জন নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক। আহতদের চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রায় ৮৬ ঘন্টা চেষ্টার পর বিএম ডিপোর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। আগুনে ডিপোর কয়েকশত কন্টেইনারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পুড়ে যায়। এ ঘটনায় ৭ জুন সীতাকুণ্ডে থানার এসআই আশরাফ সিদ্দিকী বাদী হয়ে ডিপোর আট কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে দন্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় একটি মামলা করেন। আসামীরা হলেন, বিএম ডিপোর মহাব্যবস্থাপক নাজমুল আক্তার খান, উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নুরুল আক্তার খান, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালেদুর রহমান, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্বাস উল্লাহ, জ্যেষ্ঠ নির্বাহী (প্রশাসন) নাছির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ, ডিপোর শেড ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী ডিপো ইনচার্জ নজরুল ইসলাম। সীতাকুÐ থানা পুলিশ প্রথমে মামলার তদন্ত করলেও পরে তদন্তভার পায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ডিপো কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির অভিমত ছিল, মালিকপক্ষ এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো ওই ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি গত বছরের ৬ জুলাই প্রতিবেদন দেয়। অগ্নিকান্ডের পর বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শনে ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থাকার বিষয়টি উঠে আসে। বিএম ডিপোর মূল প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের সহযোগী আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স থেকে এসব রাসায়নিক বিদেশে রপ্তানির জন্য সেখানে রাখা ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইড্রোজন পার অক্সাইডই ডিপোতে আগুনের উৎস।
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার মো. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের প্রধান চারটি ভুলের কারণে ডিপোতে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করা হয়। ভুলগুলো হলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, অগ্নি নিরাপত্তার জন্য ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকা ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএম ডিপোতে ক্যামিকেলসহ বিপজ্জনক পণ্যের কন্টেইনার এবং পোশাকসহ অন্য রপ্তানিবাহী পণ্যের কনটেইনার একসঙ্গে রাখা হতো। নিয়ম মেনে বিপজ্জনক পণ্য আলাদা রাখা হলে এত মানুষ হতাহত হতো না।
প্রতিবেদনে ডিপোতে বিস্ফোরণের জন্য ডিপো মালিকের আরেক প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যালকেও দায়ী করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে ধোয়ার কুন্ডলী কিভাবে শক্তিশালী বিস্ফোরণে রূপান্তরিত হলো তার কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। আগুনের সূত্রপাত হিসেবে সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা, কেমিক্যাল ভর্তি জার ও নাশকতার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলা হয় ।
ঘটনার প্রায় এক বছর পর ২ মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার ৮ আসামীকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ডিপোতে বিস্ফোরণের জন্য কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তদন্তে আমরা দেখেছি এটা নিছক দুর্ঘটনা। ঘটনার সাথে যারা আসামি, তারা কেউ সংশ্লিষ্ট না। বিস্ফোরক রাখার জায়গায় কোনো সমস্যা হয়তো থাকতে পারে। এগুলো দেখার আলাদা সংস্থা আছে, তারা প্রতিবেদন দেবে।
জেলা পিপি অ্যাডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী জানান, আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে পিপিকে দেখানোর বিধান থাকলেও পুলিশের প্রতিবেদন দেখানো হয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আর কোনো সরকারি সংস্থার তদন্ত কার্যক্রম থাকলে সেটা হয়তো চলবে। তবে ফৌজদারি আর কোনো কার্যক্রম আপাতত চলবে না। ফলে মামলার আসামিরা সবাই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে বলেই আদালত তা গ্রহণ করেছেন। আদালতের আদেশের বিষয়ে কিছু বলার নেই। তবে ইতিপূর্বে এই ঘটনার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের করা দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতির বিষয়টা এসেছিল। সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। অবহেলাজনিত ঘটনা। এটা গোডাউন নয়, কন্টেইনার ডিপো। যাদের রাসায়নিক পণ্য রাখা হয়েছিল তাদেরই ডিপো। তারা ফায়ার সার্ভিসকেও তথ্য দেয়নি যে সেখানে রাসায়নিক ছিল। এখন যদি পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনকে সঠিক বলে মেনে নেই তাহলে আগের দুটি সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনকে তর্কের খাতিরে মিথ্যা বলতে হয়।
তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকেই দেখা গেছে বিএম ডিপোর মালিকপক্ষের হাত অনেক লম্বা। শুধু কয়েকজন কর্মচারি কেন আসামি হয়েছিল মামলায়। পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণকারীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গিয়েছিল কেন। তাহলে এর আগে তাজরীন গার্মেন্টসসহ অন্য ঘটনায় মালিকরা কেন আসামি হয়েছিল। তারা আসামি হলে বিএম ডিপোর মালিকদের কেন আসামী করা হয়নি, প্রশ্ন এই সিনিয়র আইনজীবীর।