আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে আনাই আওয়ামী লীগের বড় চ্যলেঞ্জ। এ চ্যলেঞ্জ কি ভাবে মোকাবেলা করবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তা এখন সব মহলে আলোচনার বিষয়। যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কোন দলকে নির্বাচনে আনা আওয়ামী লীগের কাজ নয়। এ কাজ নির্বাচন কমিশনের। আবার নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে,নির্বাচন আয়োজন করায় হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কাজ। কোন দলকে নির্বাচনে আনা কমিশনের এখতিয়ার নেই। এ কাজ সরকার করবে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরের বিষয় হচ্ছে যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে তাহলে এই নির্বাচন অর্থহীন হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মনে করছেণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন। আবার এই নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহণ করে সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
তবে এসব ঘটনার দৃশ্যপটে আড়ালে থাকা বেগম খালেদা জিয়া যে কোন সময় সামনে চলে আসতে পারেন বলে ধারনা করা হচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচন নিয়ে নানা বিষয়ে খালেদা জিয়ার পরামর্শ নিতে তার সাথে সাক্ষাৎ করছেন ঘন ঘন। এমনও হতে পারে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এক জায়গায় বসে কথাও বলতে পারেন নির্বাচন বিষয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, আগামী নির্বাচন ২০১৪ বা ২০১৮ এর মত হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। ২০১৪ তে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন করেছিলেন এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিল সেটি এবার সম্ভব হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ। অংশগ্রহণমূলক বলতে তারা বিএনপির অংশগ্রহণের কথাটি ইঙ্গিত করেছেন। ফলে বিএনপি যদি কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় সুনিশ্চিত হবে বটে, কিন্তু সেটি আন্তর্জাতিকভাবে এবার গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এরকম অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০১৪-এর মত টানা পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করতে পারবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা অনেক বেশি বিস্তৃতি লাভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দফায় দফায় বিভিন্ন মহলের সাথে বৈঠক করা হচ্ছে।
এদিকে গত শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) সিলেটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন নিজের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবাধ নির্বাচন চাইলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় না।
এর পরই রবিবার দপুরে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদ‚তের সঙ্গে দেখা করেন মির্জা ফখরুলসহ অন্য দুই নেতা। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েই আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেসবুক পেজে। তার পরই গত রবিবার (১৭ এপ্রিল) রাতে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজায় প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা অবস্থান শেষে মির্জা ফখরুল। এসব বিষয় জানাতেই খালেদা জিয়ার সঙ্গে মির্জা ফখরুল সাক্ষাৎ করেন বলে জানান বিএনপির উল্লিখিত সূত্র।
এ রকম বাস্তবতায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে আওয়ামী লীগ সংকটে পড়তে পারে বলে কোন কোন মহল মনে করছেন। আবার শেষ পর্যন্ত যদি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হয় তাহলে বেশ কিছু ছাড় দিতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি আপোষ ও সমঝোতার মধ্যে দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে আসবে যেখানে বিএনপির পক্ষেও কিছু কিছু ছাড় দিতে হবে। যেমন নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতা সীমিত করা বা সরকারে অন্তত কয়েকজন নির্দলীয় ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। যদি এসব করা হয় তাহলে বিএনপি উজ্জীবিত হবে। বিশেষ করে বিএনপি’র পক্ষ থেকে একাধিক বৈঠকে বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাসকে বলা হয়েছে যে, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। যেন তারা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।
এ রকম ঘটনা যদি শেষ পর্যন্ত ঘটে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি আগামী নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দীতা গড়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে কোনো অবস্থাতেই যেন ২০১৮ এর মত নির্বাচন না হয় সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষক মহল যেমন সচেতন তেমনি বিএনপিও সচেতন। এই বাস্তবতায় নির্বাচনে জয়লাভ আওয়ামী লীগের জন্য সহজলভ্য হবে না। অনেকেই মনে করছেন যে, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের অনেক এমপিদের মধ্যে এক ধরনের অহংকার, অহমিকা তৈরি হয়েছে। সেই অহংকার এবং অহমিকার কারণে জনগণের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। সেই নেতিবাচক ধারণাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার জন্য আওয়ামী লীগকে অবশ্যই কিছু কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। সেই জন্য আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য কোনোভাবেই সহজ বিষয় হবে না। চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার জন্য আওয়ামী লীগকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও আর্ন্তজাতিক উইংয়ের সদস্য আমীর খুসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ যে ভাবেই যা করুক আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে সাজাতে হবে। সরকারের আজ্ঞাবহ প্রশসন দিয়ে আগামী নির্বাচন হবে না। জনগন নিজের ভোট নিজে দেয়ার অধিকার ফিরে পেতে হবে। আজকে জনগন ঐক্যবদ্ধ। বিএনপিকে বাদ দিয়ে এ দেশে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বিএনপি নির্বাচনে না আসলে নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। বর্তমান সরকারের অধীনেই সংবিধান মেনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোন দল নির্বাচনে না আসলে তা সেই দলের ব্যাপার।
তিনি বলেন, বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে আসবে। তাদের দলের অনেক প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছে। তারা প্রস্তুুতি নিচ্ছি। আওয়ামী লীগ চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করে করেই এত দূর আসছে। চ্যলেঞ্জকে আওয়ামী লীগ ভয় পায় না।