বার্তা ‘ক্লিয়ার এন্ড লাউড’
* তৃণমূলকে প্রধানমন্ত্রী # নির্বাচনে আসবে বিএনপি # পশ্চিমারা চায় পুতুল সরকার # বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দল থেকে চির বিদায় * ‘জেলায় জেলায় খোন্দকার মোস্তাকরা আছে, তারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য কাজ করছে’
আগামী নির্বাচন নিয়ে দলীয় এমপিদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, ভোট বানচালের ষড়যন্ত্র করতে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে। অন্যদিকে, পশ্চিমারা দেশে একটা পুতুল সরকার বসানোর ষড়যন্ত্র করছে। এমন নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনটা সত্যি সত্যি চ্যালেঞ্জের হবে জানিয়ে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে দলীয় এমপিদের আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। গত রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ ধরনের একটা ধারণা দিয়ে আসছিলেন যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসবে না। বিএনপি নিজেও বলছে, তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পূরণ ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে এধরনের নিশ্চিত তথ্য রয়েছে যে, বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে আসবে।
বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে আসার একটা কৌশল নিতে পারে বিএনপি। রোববারের সভায় প্রধানমন্ত্রী এরকমই একটি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন, তারা (বিএনপি) নির্বাচনে আসবে নির্বাচন বানচাল করার জন্য!
জানতে চাইলে নরসিংদী-৩ আসনের এমপি জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহন বলেন, সংসদীয় দলের সভায় দলীয় প্রধান বলেছেন- একটি মহল নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছে। আমরা একটা ফ্রি, ফেয়ার নির্বাচন করবো। নির্বাচনে বিএনপি আসবে কি আসবে না- এটা তাদের বিষয়। তবে নির্বাচনে বিএনপি আসবে এটা ধরে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তার জন্যই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কেউ যেন মোনাফেকি না করে। প্রধানমন্ত্রী নিজের নির্বাচনী এলাকায় এমপিদের অবস্থান তৈরির নির্দেশ দিয়ে বলেন, এলাকার প্রতিটি ভোটারের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। প্রচার করতে হবে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নির্বাচনমুখী হয়ে জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করতে পারে। সে ব্যাপারে সংসদ সদস্যদের এখন থেকেই তৎপর হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও চ্যালেঞ্জিং হবে। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে জয় সহজ হবে না। এবারের নির্বাচন কঠিন হবে। কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা সব ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। জিততে হলে জনসম্পৃক্ততা ও জনপ্রিয়তা বাড়ান। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তুলে ধরেন।
বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে নানামুখি ষড়যন্ত্র চলছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৃতীয় কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় এনে দেশকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার কথা তুলে ধরে বলেন, সম্প্রতি লুলা ডি সিলভার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, যেভাবে ব্রাজিলকে গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলাম এসে দেখি ছারখার করে দিয়েছে। এখন আমাদের দেশেও যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে দেশটা ধ্বংস করে দেবে। সুতরাং সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ থেকে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যোগ্যতা দিয়ে এবার মনোনয়ন পেতে হবে। এই সংসদে যারা আছেন তাদের অনেকে মনোনয়ন নাও পেতে পারেন। তাতে কেউ দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা বা বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড করবেন না। যারা করবে তার রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে। কাউকে চেয়ার দেয়া হবে না।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তাই নিজ যোগ্যতায় জয়ী হয়ে আসতে হবে- এমন বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসতে পারে। নির্বাচনে এলেও তারা নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে। যদিও বিএনপি নির্বাচনে না এলে আরও অনেক দল নির্বাচনে আসার জন্য প্রস্তুত আছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে জরিপের ভিত্তিতে যোগ্যদের মনোনয়ন দেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী মনোনয়ন দেয়া হবে। যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। এবার কারও চেহারা দেখে মনোনয়ন দেয়া হবে না। দেখে-শুনে যিনি জনপ্রিয় তাকে নমিনেশন দেবো। এখানে যারা আছেন সবাই মনোনয়ন নাও পেতে পারেন। যাকে নমিনেশন দেবো তার জন্য কাজ করতে হবে। নমিনেশন পান না পান, নৌকার বিরোধিতা করা যাবে না। যারা নৌকার বিরোধিতা করবে তাদের রাজনীতি চিরতরে শেষ বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি তার বক্তব্যকালে নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলেন। বলেন, তারা (পশ্চিমারা) জানে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে। এজন্য তারা নির্বাচন বানচাল করতে চায়। নির্বাচন বানচাল করে একটি অনির্বাচিত সরকার বসাতে চায়। এটা করতে পারলে তাদের তারা ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারে। সে কারণে নির্বাচন বাদ দিয়ে অনির্বাচিত সরকারকে চায় দেশি-বিদেশি অনেকেই। কারণ, অনির্বাচিত সরকার হলে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সুবিধা হয়।
সংসদীয় দলের সভায় নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি শামীম ওসমান বিএনপি-জামায়াতের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরে বলেন, ওরা থেমে নেই। সারা দেশে আঞ্চলিক মিডিয়াগুলোতে জামায়াত অর্থায়ন করছে। সরকার, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের এমপি, নেতা, মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা তাই লিখছে। প্রয়োজনে আমাকে মনোনয়ন দিয়েন না কিন্তু দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যিনি জিতে আসতে পারবেন তাকে জিতে আসতে হবে। হাজার বছরে বঙ্গবন্ধু এসেছেন একজন ভবিষ্যতে লাখ বছরে একজন বঙ্গবন্ধু আসবেন কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এখন প্রতি জেলায় জেলায় খোন্দকার মোস্তাকরা আছে। এরা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য কাজ করছে। এই মোস্তাকদের চিহ্নিত করতে হবে, এদের থেকে সাবধান থাকতে হবে।