বলুয়ার দিঘি ভরাটে জড়িত ১০ জনের নাম বেরিয়ে এসেছে

দেশ বর্তমান-এর প্রতিবেদনের পর ডিসি অফিসের তদন্ত: শেষ কিস্তি

চট্টগ্রামের বলুয়ার দিঘি দখলের সত্যতা পেয়েছে জেলা প্রশাসন। দ্বিশত বছরের ঐতিহাসিক এই দিঘি ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সাথে জড়িত ১০ জনকে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।পরিবেশবাদী সংগঠক ও স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের ত্বরিৎ নির্দেশে বন্দর ভূমি অফিসের সদর সার্কেল এই প্রতিবেদন দাখিল করে।

নানা কারণে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানকে একজন পরিবেশবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কর্ণফুলী নদীর উত্তর তীর,চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং চট্টগ্রামের সৌন্দর্য পাহাড় রক্ষায় তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণে এমনটাই মনে করেন চট্টগ্রামের মানুষ।

চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠক এবং স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে গত ১২ এপ্রিল জেলা প্রশাসক ঘোষণা দিয়েছিলেন, “ চট্টগ্রামের জলাশয় রক্ষার আন্দোলন প্রথম শুরু হবে বলুয়ার দিঘি থেকে এবং সেটি আজকে থেকেই।” ওইদিনই তিনি সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেন বলুয়ার দিঘির চারপাশে সরেজমিনে তদন্ত করে গত মাসে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটি ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কিভাবে দিঘি ভরাট করা হচ্ছে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। সহকারী কমিশনার প্রণীত তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যক্তি মালিকানাধীন এই দিঘির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১.৮৪২৫ একর।প্রতিবেদনে কতিপয় ভূমিদস্যু রাতের অন্ধকারে দিঘি ভরাটের কাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

দিঘি ভরাটের সাথে কারা জড়িত স্থানীয়রা তা বলতে বিব্রতবোধ করলেও সহকারী কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদনে ১০ জন ভূমি দস্যুকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ১০জনই বিভিন্ন সময়ে দিঘি ভরাট করেছেন এবং এখনও ভরাটের কাজে লিপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে দিঘি ভরাটে যাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে তারা হলেন হাজী খায়ের মোহাম্মদ, হাসান গং (পিতা-নুর মো. আল কাদেরী), মোহাম্মদ আরিফ, সিতারা গং (পিতা- মৃত নুরুল ইসলাম), রফিকুল আলম বাপ্পি, আবদুল হাই কালু, মোহাম্মদ আলী গং, মাহাবুবুল হাকিম গং, বখতিয়ার গং এবং মোহাম্মদ ছাব্বির আহমদ। প্রতিবেদনে অগ্নি নির্বাপনের ঝুঁকি এড়ানো এবং পরিবেশ রক্ষায় দিঘিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মতামত ব্যক্ত করা হয়।

দৈনিক দেশ বর্তমান পত্রিকায় ইতোপূর্বে ‘বলুয়ার দিঘি’ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৩ জুন প্রকাশিত ‘বলুয়ার দিঘির আর্তনাদ: সরেজমিন প্রতিবেদন-২’ শিরোনামে স্থানীয়দের সাথে আলাপ এবং সরেজমিন পরিদর্শনে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের নাম ওঠে এসেছে। এর মধ্যে খায়ের আহমদ নিজে দিঘি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ এবং ভরাটের কারণে দিঘি ছোট হওয়ার বিষয়টি এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সত্যতা নিশ্চিত করে সদর সার্কেল ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার মো. রাজিব হোসেন দেশ বর্তমানকে বলেন, পরবর্তী নির্দেশনা পেলে বলুয়ার দিঘি ভরাট করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বলুয়ার দিঘিসহ চট্টগ্রামের অন্যান্য জলাশয় রক্ষার বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানান, বলুয়ার দিঘি উদ্ধারে সব ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে।দিঘির চারপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দেয়া হবে যাতে এলাকার মানুষ সুস্বাস্থ্যের চর্চা করতে পারে। অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে নেওয়ায় উচ্ছেদ কার্যক্রম কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে, যোগ করলেন জেলা প্রশাসক।

গত ৭ জুন ভূমিমন্ত্রী ও ভূমি সচিবের সাথে সাথে বৈঠকের বিষয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জলাশয় রক্ষায় প্রকল্প গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। বিষয়টি তাঁরা আমলে নিয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে রক্ষা পাবে দিঘি-জলাশয় এবং বিপন্ন পরিবেশ।