অপিরকল্পিত নগরায়ন আর সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জলাধার বলুয়ার দিঘির আকার ছোট হয়ে আসছে। ভূমির মূল্যবৃদ্ধি, বিএস জরিপে ‘নাল’ জমি দেখিয়ে দিঘির পাড়ে গড়ে ওঠেছে বহুতল ভবন। দিঘির চারপাশে বেশিরভাগ স্থাপনাই অবৈধ। সেমিপাকা এবং টিনসেডের ঘর ও দোকানপাট তৈরি করে বর্তমান চতুর্মুখী ভরাটের হুমকিতে রয়েছে ঐতিহাসিক এই দিঘি। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের বহুমুখী সংকটের শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তি মালিকানাধীন এই দিঘির কতিপয় অসাধু ওয়ারিশ অর্থলোভে দিঘির চারপাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। পরিবেশের সুরক্ষায় আর এস এবং বিএস জরিপে দিঘি উদ্ধারের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র কোরবানীগঞ্জে অবস্থিত বলুয়ার দিঘির আয়তন নিয়ে নানা মত থাকলেও ভরাট নিয়ে দ্বিমত নেই দিঘির আশেপাশের স্থানীয়দের। বিএসমুলে দিঘির আয়তন প্রায় সাড়ে ছয় কানি। তবে বর্তমানে আয়তন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে ভূমি দস্যূদেও থাবায়।
স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দিঘিতে যাদের অংশনামা বেশি রয়েছে তারাই নানা কৌশলে দখল বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত।নানা কৌশলে দিঘি ভরাট করছে।কেউ ময়লা আবর্জনা ফেলে, কেউ রাতের অন্ধকারে বালি কিংবা মাটির বস্তা ফেলে, কেউবা ইট-সিমেন্টের পাকা পিলার তুলে গিলে খাচ্ছে এই ঐতিহাসিক জলাশয়।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, বলুয়ার দিঘির সবচেয়ে বেশি ভরাট হয়েছে পূর্বপাড়ে। পূর্বপাড়ে মাঝামাঝি জায়গায় একটি চারতলা পাকা (বর্তমানে টিনসেড দিয়ে আরো এক তলা সম্প্রসারণ বরা হয়েছে), পূর্বপাড় পুকুরঘাট ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং পূর্ব-উত্তর পাড় কোনায় অবস্থিত খানকায়ে শরীফ ছাড়া সবগুলো স্থাপনা টিনের কিংবা সেমিপাকা। পূর্বপাড়ে মসজিদের কোণা থেকে খানকায়ে শরীফ পর্যন্ত প্রায় ৩০টির মতো দোকান রয়েছে, যার বেশিরভাগ প্লাস্টিক এবং ভাঙ্গারীর দোকান। এসব স্থাপনার কোনোটিরও সিডিএর অনুমোদন নেই। দিঘির পূর্বপাড়ের মাঝামাঝি স্থানে ২০০৫ সালে আলহাজ্ব নুর আহমদ সওদাগর আল কাদেরী কমপ্লেক্সে ‘পুর্বপাড় পুকুরঘাট ফোরকানিয়া মাদ্রাসা’ ভবনের উদ্বোধন করেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান।
স্থানীয়রা জানান, মাদ্রাসার নামে ভবন তুলে দখল করা হয়েছে পুকুরের অংশ। পূর্বপাড়ের স্থাপনাগুলো রাস্তা থেকে পশ্চিমে পুকুরের দিকে সাত-আট ফুটের বেশি ছিলো না। কিন্তু এসব এসব অবৈধ স্থাপনা পেছনে দিঘির অংশ দখল করে সম্প্রসারণ করায় বর্তমানে ৩০ ফুট থেকে ৪০ ফুফ পর্যন্ত বড় করা হয়েছে। জরাজীর্ণ খানকায়ে শরীফ পেছনে পুকুরের দিকে বিশাল অংশ দখল করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
দিঘির পশ্চিমপাড়েও চলছে দখলের মহোৎসব। কোরবানীগঞ্জ জামে মসজিদের দোতলা থেকে চতুর্মুখী দিঘি দখলের মহোৎসবের বাস্তব চিত্র দেখা যায়। পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় অবস্থিত সাততলা ভবনটি গড়ে ওঠেছে দিঘি দখল করে। স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, সাব্বির আহমদ ভবনটির মালিক। ভবনটি প্রায় ছয় গন্ডা জায়গার উপর নির্মীত হলেও সাব্বির আহমদের নিজস্ব জায়গা দেড় গন্ডার বেশি নয়। নতুন ভবনটি কিভাবে সিডিএর প্ল্যান পেলো সে প্রশ্নও করেছেন অনেকে।
এ প্রসঙ্গে সিডিএর সংশ্লিষ্ট এলাকার ইমারত পরিদর্শক তোফায়েল আহমদ দেশ বর্তমানকে বলেন, কোরবানীগঞ্জ এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য খুব একটা প্ল্যান জমা পড়ে না। বিএস দাগে পুকুর-দিঘি থাকলে সিডিএ নকশা অনুমোদন করে না। যদি কেউ অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগ করেন তাহলে সিডিএ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। আমার জানামতে, ভবনটির ব্যাপারে সিডিএতে কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি। এ ব্যাপারে ভবন মালিকের সাথে যোগযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
দিঘির পশ্চিম পাড়ে পশ্চিম পাড়ে রয়েছে প্রায় ৪০টির মতো দোকান। যার কোনোটির সিডিএর অনুমোদন নেই। পশ্চিম পাড়ে দোতলা জরাজীর্ণ ‘শাহ আবদুল ছমদ আমানত ওয়াকফ এস্টেট’। ওয়াকফ এস্টেটের মুল মালিক ছিলেন আবদুল হামিদ। তার মৃতে্যুর পর জামাতা মোহাম্মদ সেলিম এটি দেখাশুনা করেন। এটি এতই জরাজীর্ণ যে, ছাদের আস্তর খসে পড়ছে। ওয়াকফ এস্টেটের নিচের দোকানগুলোর আকার ২০ ফুটের বেশি ছিলো না। বর্তমানে এসব দোকান কোথাও কোথাও ৩০ ফুট পর্যন্ত পেছনে বর্ধিত করা হয়েছে। এছাড়া ওয়াকফ এস্টেটের দুই পাশে গড়ে ওঠা সেমিপাকা বিপি সিট, জিপি সিট ও স্টিল আলমিরার দোকানগুলো পেছনের অংশ দিঘি দখল করে গড়ে ওঠেছে।
দিঘির দক্ষিণ পাড়ে চারটি সেমিপাকা স্থাপনা গড়ে ওঠেছে। ভাড়াটিয়াদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, এক বছর আগে এগুলো নির্মাণ করা হয়। এসব সেমিপাকা স্থাপনার অংশবিশেষ দিঘি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তর পাড়ে বালি এবং মাটির বস্তা ফেলে গিলে ফেলা হচ্ছে দিঘির আয়তন।তথ্যানুসন্ধান এবং স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দিঘি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সাথে যারা জড়িত তাদের সকলের দিঘির অংশনামা রয়েছে। ব্যক্তি কিংবা সরকারি মালিকানাধীন জলাশয় ভরাট বেআইনী-এটি জানা সত্ত্বেও দখল বাণিজ্যে লিপ্ত। সিডিএর অনুমোদনবিহীন সেমিপাকা দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিচ্ছেন। এসব অর্থলোভী মানুষের কারণে বলুয়ার দিঘির পারিপাশ্বিক পরিবেশ বিপন্ন।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, হাজী মোহাম্মদ আবুল খায়ের, মোহাম্মদ হাসান (পিতা-নুর মো.আল কাদেরী), মোহাম্মদ আরিফ, সিতারা বেগম, রফিকুল আলম বাপ্তি, আবদুল হাই কালু, মোহাম্মদ আলী গং, মাহবুবুল হাকিম, বখতিয়ার গং এবং মোহাম্মদ সাব্বির আহমদ দিঘি ভরাটে জড়িত।
এ ব্যাপারে দিঘি দখলে অভিযুক্তদের একজন হাজী খায়েরের সাথে আলাপকালে তিনি দিঘি ভরাটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কম-বেশি সবাই দিঘি ভরাট করে দোকান-পাট নির্মাণ করেছেন, আমি দিঘিরও পশ্চিম পাড়ে কিছু অংশ ভরাট করেছি। তার দাবি, দিঘির পশ্চিম পাড়ে তেমন ভরাট হয়নি, পূর্ব পাড়েই বেশি ভরাট হয়েছে।
দিঘিটির আয়তন কত-এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে হাজী খায়ের বলেন, ছয় থেকে সাড়ে ছয় কানি হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ভরাটের কারণে দিঘি ছোট হয়ে গেছে। বলুয়ার দিঘি মহল্লা কমিটির সভাপতি কুতুব উদ্দিন সেলিম দেশ বর্তমানকে বলেন, দিঘির কিছু ওয়ারিশ ভরাট কাজে লিপ্ত। তবে বেশিরভাগ ওয়ারিশ চান দিঘিটি রক্ষা করতে।
দীর্ঘদিন ধরে ‘জলাশয় বাঁচাও আন্দোলন’-এর ব্যানারে সক্রিয় রয়েছেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল আলিম (অ্যালেক্স আলিম)। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতামুলক নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এরই ধারাবাহিকতায় ‘বলুয়ার দিঘি’ রক্ষায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের দিঘি রক্ষা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে শিগগির কাজ শুরু করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। ইতোমধ্যে প্রশাসন কাজ শুরু করেছেন। এই শিক্ষাবিদ বলেন, দিঘির চারপাশ দখলে ওয়ারিশরা জড়িত হলেও এটি সংখ্যায় নগন্য তবে তারা খুবই সংঘবদ্ধ এবং প্রভাবশালী। এসব ভূমি দস্যূদের কাছে আমরা বারবার হেরে যাচ্ছি। প্রশাসনের পাশাপাশি জনসাধারণকে নিজেদের স্বার্থে পুকুর-দিঘি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। না হয় বিপন্ন হবে পরিবেশ।
পুকুর ও দিঘি ভরাটের ব্যাপারে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস দেশ বর্তমানকে বলেন, সিডিএ পুকুর-দিঘি ভরাট করা ভূমিতে আমরা কোনো নকশা অনুমোদন দিই না। বিএস জরিপে যদি পুকুর-দিঘি কিংবা জলাশয় উল্লেখ না থাকলে সেক্ষেত্রে সিডিএ কারো প্ল্যান আমরা আটকাতে পারে না।
দেশ বর্তমান/এআই