যান চলাচলের জন্য উম্মুক্ত হলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বহুল প্রত্যাশীত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। প্রথম দিন ইতিহাসের সাক্ষী হতে নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছেছেন অনেকেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই অপেক্ষা করতে থাকে বেশ কিছু যান। ভোর ছয়টা থেকে টানেলটি জনসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। ছয়টার সঙ্গে সঙ্গে ২৫০ টাকা টোল দিয়ে প্রথম টানেলে ঢুকে একটি মাইক্রোবাস। এরপর টোল দিয়ে একে একে পার হতে শুরু করে অন্যান্য যানবাহন। বঙ্গবন্ধু টানেল পার হতে পেরে আনন্দে উচ্ছ্বসিত যাত্রী ও চালকরা। প্রথম দিন বিরোধী পক্ষের ডাকা হরতালও তেমন প্রভাব পড়েনি, বরং শুরুর ১২ ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার যানবাহন যাতায়াত করে, যেখানে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি টোল আদায় হয় বলে জানান টানেল কর্তৃপক্ষ।
আজ রোববার যান চলাচলের প্রথম দিন ভোর থেকে টোল দিয়ে টানেল পার হওয়ার জন্য এবং ইতিহাসের সাক্ষী হতে নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছেছেন অনেকেই।
রবিন নামে এক কারের যাত্রী বলেন, নদীর তল দিয়ে পার হতে পেরে যা আনন্দ লাগছে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতেও দ্বিধা করেননি এই যাত্রী।

প্রথম দিনে বঙ্গবন্ধু টানেল পাড়ি দিতে মাইক্রোবাস ভাড়া করে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল চট্টগ্রাম স্টুডেন্ট প্যানেলের ৮ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এম দস্তগীর দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, মনে হলে দেশ নয়, বিদেশের কোনো সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করছি। মাত্র চার মিনিটের কম সময়ে আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গা চলে এসেছি। এত দ্রুত পথ শেষ হবে সেটা ভাবতেই পারিনি। আব্বাস উদ্দিন মানিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এই বঙ্গবন্ধু টানেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
টানেলে চলতে পারবে ১২ ক্যাটাগরির যানবাহন। এজন্য সর্বনিম্ন টোল দু’শ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে চলাচল করতে পারবে না মোটরসাইকেল বা তিন চাকার যান।
সন্ধ্যায় প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ চৌধুরী দেশ বর্তমানকে বলেন, আজ থেকে (রোববার) থেকে যান চলাচল শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই বেশ সাড়া পেয়েছি। সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার গাড়ি যাতায়াত করেছে এবং এত প্রায় আড়াই লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে। আজকে সরকার বিরোধী পক্ষের হরতাল থাকলে তেমন প্রভাব পড়েনি। বরং সন্ধ্যার পর থেকে গাড়ি চলাচল বেড়েছে। আশাকরি সামনে গাড়ি চলাচল আরও বাড়বে এবং টোল আদায়ও বাড়বে। তবে, আপাতত তিন চাকার যান ও মোটরসাইকেল চলবে না। কেউ হাঁটাহাঁটিও করতে পারবেন না টানেলে। কেউ যদি এমন দুঃসাহস দেখায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় আসবেন। কেননা টানেলের ভেতরে বাইরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ চলছে বলেও জানান তিনি।

টোল আদায়ে আনোয়ারা প্রান্তে ১৪টি বক্স বসানো হয়েছে। সেতু বিভাগের পূর্বাভাস অনুসারে, চালুর পর প্রথম বছরে প্রতিদিন এই টানেল পার হবে ১৭ হাজার ৩৭৪টি গাড়ি। যার মধ্যে ৩ হাজার ২১৮টি ভারী যান। ২০২৫ সালে প্রতিদিন পার হওয়া যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৮ হাজার ৩০৫টিতে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল পারাপারে সর্বনিম্ন টোল ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাইভেটকার ও জিপের জন্য। সর্বোচ্চ টোল দিতে হবে ট্রাক ও ট্রেইলরকে। ট্রেইলরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত টোলের সঙ্গে প্রতিটি এক্সেলের জন্য আরও ২০০ টাকা করে বাড়তি দিতে হবে। এছাড়া পিকআপ ২০০, মাইক্রোবাস ২৫০, বাস (৩১ সিটের কম) ৩০০, বাস (৩২ আসনের বেশি) ৪০০, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০, ট্রাক (৫ টন পর্যন্ত) ৪০০, ট্রাক (৫.০১ থেকে ৮ টন) ৫০০, ট্রাক (৮.০১ থেকে ১১ টন) ৬০০, ট্রাক ও ট্রেইলর (৩ এক্সেল) ৮০০, ট্রাক ও ট্রেইলর (৪ এক্সেল) ১০০০ এবং চার এক্সেলের বেশি হলে প্রতি এক্সেলের জন্য ২০০ করে দিতে হবে।
এর আগে শনিবার (২৮ অক্টোবর) বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে সেখানে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেন তিনি। ওই সময় বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রামবাসীর জন্য বিশেষ উপহার বলে ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে আনোয়ারা উপজেলাকে যুক্ত করেছে। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সাগর উপকূল ঘিরে শিল্পের নতুন দুয়ার খুলে গেছে।

তিন দশমিক ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস অর্থনীতি ও যোগাযোগ খাতে। কেননা, এতে করে নদীর দক্ষিণাংশে শিল্পায়ন, রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের দূরত্ব কমে আসা, পর্যটনখাতের বিকাশ, গভীর সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রীক পণ্য আনা নেয়া, এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কসহ নানা ক্ষেত্রে বড় এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে।
এই টানেল শুধু অভ্যন্তরীণ সুবিধাই বাড়াবে না, বহির্বিশ্বে জানান দেবে বাংলাদেশের নির্মাণ সক্ষমতারও। এতে সম্ভাবনা জাগছে অন্যান্য নদীর তলদেশে নতুন টানেল নির্মাণের। তাই এখন বঙ্গবন্ধু টানেলের সুফল সার্বিকভাবে পেতে আরও কিছু অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর ওপর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বঙ্গবন্ধু টানেলের মেয়াদ হবে অন্তত একশ বছর। যা প্রথম পাঁচবছর রক্ষণাবেক্ষণ করবে চীনা প্রতিষ্ঠান। এরপর প্রশিক্ষণ আর রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে তার পরিচালনার দায়িত্ব নেবে বাংলাদেশ। এই টানেলের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ।