আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। এবারের নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে, এমনটা মাথায় রেখেই বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, এসপি এবং ইউএনও পদে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রশাসনের শীর্ষ পদে রদবদলের পাশাপাশি কয়েক দফা পদোন্নতিও দেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনকালীন সময়ে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ে দক্ষ এবং চৌকস কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন ও স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই পুলিশের ডিআইজি পদে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর পাশাপাশি পাঁচ শতাধিক পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাকে রদবদলের পাশাপাশি পদোন্নতি দেওয়া হবে। এসব কর্মকর্তা পদোন্নতির পরেও একই দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাবে। আগামী এক মাসের মধ্যেই ২২ থেকে ২৭টি জেলার ডিসি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে এ পদে প্রশাসনের ২২ ব্যাচের কর্মকর্তা রয়েছেন অন্তত ২০ জন। এরমধ্যে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় তাদেরকে প্রত্যাহার করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পদায়ন করা হবে। ওই সমস্ত জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এর বাইরে আরও কয়েকটি জেলার ডিসিকে বদলি করা হতে পারে। আর যারা বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্বে আছেন তাদের জন্য সামনে অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) ভূমিকা বেশি, তাই এই মাঠ প্রশাসনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের রদবদল বা পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসকরা রির্টানিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালন করেন এবং এসপিরা নিজ নিজ জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে দায়িত্বপালন করেন। ডিসি এসপিরা যেখানে কাজ করবেন সংশ্লিষ্ট জেলার সাথে আগেভাগেই পরিচিত না হলে নির্বাচন পরিচালনায় বেগ পেতে হবে। তাই আগেভাগেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের ডিসি নিয়োগ দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ চলছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত বৈঠকে দায়িত্বশীল সব কর্মকর্তাকে উপস্থিত থাকতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে যদি কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে সেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার।
কয়েক দফা পদোন্নতির মধ্যে প্রশাসনের ২২ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। ইতমধ্যেই এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই তাদের পদোন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরপরই পদোন্নতির কাতারে আসবে প্রশাসনের ২৯ তম ব্যাচ। এ ব্যাচের সিনিয়র সহকারী সচিবরা এরই মধ্যে উপসচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। পদোন্নতিযোগ্যদের তথ্য চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যেই চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে চলতি বছর একবার অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হলেও নির্বাচনের আগে আরও একবার পদোন্নতি দেওয়া হতে পারে। ১৮ ব্যাচকে মূল ধরে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। চলতি বছরে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হওয়ায় স্বাভাবিক নিয়মে এবার পদোন্নতি বিবেচনায় আসার কথা নয়। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে পদভেদে দক্ষ ও চৌকস অফিসারের রিজার্ভ বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত মে মাসে ১৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লেগেছে। তবে দেরি করে পদোন্নতি দিলেও অন্যবারের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন এবার। এটাও নির্বাচনী পুরস্কার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই। এর আগে একাধিকবার পদোন্নতিযোগ্য মূল ব্যাচের অর্থাৎ ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা থাকার পরও ১০০ জনের বেশি অতিরিক্ত সচিবের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।
প্রয়োজনে ব্যাচ ভেঙে একই ব্যাচকে মূল ধরে দুই বছরে দুইবার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সময় মূল ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন মাত্র ৪৯ জন। তাদের মধ্যে ৪২ জনসহ ১১৪ জনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসনে যুক্ত হওয়া ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যাচের লেফট-আউট কর্মকর্তারা রয়েছেন।
সূত্র জানিয়েছে, আস্থাভাজন অফিসারদের নির্বাচন পর্যন্ত রাখতে এরই মধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়িয়েছে সরকার। প্রশাসন এবং প্রশাসনের বাইরে সচিব ও সিনিয়র সচিব মিলিয়ে এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আছেন। পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদগুলোতে নিকট অতীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নজির নেই। সেখানে আইজিপি ও র্যাবের মহাপরিচালককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আগামী নির্বাচনের আগেই প্রশাসনের শীর্ষতম দুই পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের স্বাভাবিক কর্মকাল শেষ হচ্ছে। তাদের দু’জনকেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও সূত্র উল্লেখ করেছে।
এদিকে শীর্ষ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ার কারণে প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। তাই চুক্তির কারণে সচিব হতে না পারা কর্মকর্তাদের জন্য বার্তা দেওয়া হচ্ছে, যারা সচিব হওয়ার মতো যোগ্য তাদের এ সরকারই পদোন্নতি দিয়ে এই পর্যন্ত এনেছে। অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে তারা এমনিতেই টার্গেটে পড়বেন। তাই বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় এলে তাদের বিষয়টিও বিশেষ বিবেচনায় দেখা হবে। টানা দেড় দশকে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার পদোন্নতি দিলেও কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতির বাইরে থেকে গেছেন। পদোন্নতি বঞ্চিত এসব কর্মকর্তা যাতে সংঘবদ্ধ হয়ে বিরোধী কোনো বৈঠকে না যান, সে বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সোমবার ( ১৯ জুন) সংসদে বলেছেন, দেশের সব মন্ত্রণালয়/অধিদফতর ও মাঠ প্রশাসনে তিন লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনপ্রশাসনে অনুমোদিত পদ ১৪ লাখ ৯ লাখ ৬০৬টি। এরমধ্যে কর্মরত আছেন ১০ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪০ জন। বর্তমানে শূন্য পদ পূরণের জন্য সব মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদফতরেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।