জয়নাল আবেদীন কাজল, পেশায় একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ছিপাতলী গ্রামের বাসিন্দা কাজল ২০ মাস আগেও অনলাইন গণমাধ্যমে চাকরি করে পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে চলছিলেন। তাঁর আত্মীয় ফটিকছড়ি উপজেলার দক্ষিণ নিশ্চিন্তাপুর এলাকার বাসিন্দা প্রবাসী এমদাদুল্লাহ নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাল বেতনের ভিসার প্রলোভন দিলে লুফে নেন কাজল। পরিবারকে আরেকটু স্বাচ্ছন্দে চালাতে ধার-দেনা করে ৬ হাজার দিরহাম সমপরিমাণ টাকার বিনিময়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান। এর আগের বছর একই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের ভিসা নিয়ে কাজলের ছোট ভাই নিয়াজ মোর্শেদও সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলেন। ভালই চলছিল দুই ভাইয়ের প্রবাস জীবন। কিন্তু কাজল যাওয়ার ৮ মাস পর ভিসা দাতা এমদাদুল্লাহ গোপনে তার প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে স্বপরিবারে দেশে চলে আসলে দুই ভাইয়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। প্রায় তিন মাস বর্তমানে ভিসা ও কর্ম হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করেন তারা। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে দুই ভাইয়ের ১০ হাজার দিরহাম জরিমানা জমেছে। সেই সাথে প্রতিদিন গড়ে বাড়ছে ১০০ দিরহাম জরিমানা। নতুন করে আবার সবকিছু আগের মতো শুরু করতে হলে গুণতে হবে অন্তত ৩০ হাজার দিরহাম। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ লাখ টাকা। একদিকে অনিশ্চত জীবন অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণ, সব মিলে যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
গত ২১ জানুয়ারি ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদিন কাজল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘এই দায় কার? যদি আমার সাথে কোন লেনদেন থাকে বা আমার অপরাধ কি? এখানে লিখে যান। আশা করি দায় স্বীকার করে সংশোধনের পথে আসবেন’। ভিডিও বার্তায় তিনি ভিসা বাতিল কে করেছেন বা কারা ষড়যন্ত্র করেছেন তার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
গতকাল বিকালে আমিরাত থেকে মোবাইলে ফোনে ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদীন কাজল দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানান, আমি পরিবারকে নিয়ে সুন্দরমতো চলছিলাম। প্রবাসী এমদাদুল্লাহর প্রলোভনে পড়ে চাকরি ছেড়ে টাকা-পয়সা ধারদেনা করে আমার ভাইয়ের জন্য ভিসা কিনি। পরিশ্রম করে দুটো টাকা পয়সা জমানোর জন্য পরিবার পরিজন ছেড়ে আমিও প্রবাসে পাড়ি জমাই। কিন্তু ৮ মাস পর ভিসা বিক্রেতা আমাদের না জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেন। এমনকি আমাদেরকে না জানিয়ে পরিবার নিয়ে আরব আমিরাত ত্যাগ করে দেশে চলে যান। ফলে চাকরি ছাড়া তিনমাস প্রবাস জীবনে মানবেতর জীবন যাপন করেছি। এরপর অনেক কষ্টে আমি আবুধাবিতে এবং ছোটভাই সারজার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। এমন অসহায় অবস্থার মাঝেও ২০২৩ সালের মে মাসের শেষের দিকে ভিসা বিক্রেতা মোহাম্মদ এমদাদুল্লাহ দেশ থেকে ফিরে এসে আমাদের দুজনকে ভিসার খরচ বাবদ আরও ৮ হাজার দিরহাম দিতে চাপ দেন। ওই সময় তিনি বলেন, দুবাইয়ে ফ্রি ভিসা বর্তমানে ১০ হাজার দিরহাম। তাই দুজনকে আরও ৮ হাজার দিরহাম দিতে হবে। আমরা অতিরিক্ত ৮ হাজার দিরহাম দিতে সমর্থ না হলে তিনি আমাদের হুমকি দেন। পরবর্তীতে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশীর সহায়তায় বিষয়টি মীমাংসা হয়। মীমাংসার পর আমাদের না জানিয়ে মেয়াদ থাকা সত্বেও ভিসা বাতিল করে দিয়ে আমাদের বিপদে ফেলে। এমনকি আমাদের ইমিগ্রেশন কার্ডটিও দেননি। ফলে আমাদের দুই ভাইকে ৯৬০০ দিরহাম জরিমানার ফাঁদে ফেলেন তিনি। এছাড়া প্রতিদিন দুই জনের ১০০ দিরহাম করে জারিমানাও যোগ হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ দূতাবাসসহ কমিউনিটির নেতারা এগিয়ে না আসলে আমরা দুই ভাইয়ের মরণ ছাড়া উপায় নেই। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে এমন আচরণ ও অপরাধের শাস্তি চাই।
আরেক ভুক্তভোগী কাজলের ভাই নিয়াজ মোর্শেদ জানান, এখন আমাদের কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই। এত দিরহাম জরিমানা কেমনে পরিশোধ করব তা নিয়ে প্রতিনিয়ত চিন্তায় আছি। প্রবাসে এসেও যেন চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের কবলে পড়েছি। এখন দুই ভাই নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি।
ভুক্তভোগী প্রবাসী দুই ভাইয়ের মা আনোয়ারা জানান, আমার দুই ছেলে প্রবাসে আটকে আছে। বাড়িতে কোন টাকা-পয়সা পাঠাতে না পারায় আমরাও খুব কষ্টে আছি। ধার-দেনা করে তাদের বিদেশ পাঠিয়েছি শুধু একটু সুখের আশায়। ষড়যন্ত্রে পড়ে আমার দুই ছেলে এখন নিঃস্ব। আমরা প্রতিনিয়ত দুই ছেলের অনিশ্চিত প্রবাস জীবন নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি।
অভিযোগের বিষয়টি জানতে অভিযুক্ত প্রবাসী এমদাদুল্লার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর (+৯৭৫৫৫৮৩৯২১৪)-এ কল করলে তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, আমি একবছর আগে দোকান বিক্রি করে দিয়েছি। ওদের ভিসা আমি দিলেও বাতিলের ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। ওদের সাথে আমার অনেক দ্বন্দ্ব হয়েছে। লাইসেন্স আমার নামে ছিল না।
ইমেগ্রেশন কার্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে ওদের ইমিগ্রেশন কার্ড ছিল না। ভিসা অনলাইনে আবেদন করার সময় (তৎকালীন মালিক) অর্থাৎ প্রথম পক্ষের একটি মোবাইল নম্বর ছিল।
সেই নম্বরে এসএমএস আসার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এসময় ভিসা বাতিল কে করেছে ওদেরকে প্রমাণ করতে বলে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘ওরা যদি এভাবে আমাকে ডিস্টার্ব করে, পরে যদি তাদের সমস্যা হয় সেটা আমি বুঝব না’ বলে ফোন কেটে দেন।
দেশ বর্তমান/এআই