প্রচারণায় আচরণবিধির ঘেরাটোপে চট্টগ্রামে নীতিমালা ভঙ্গের হিড়িক
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন :
সৌমেন ধর ও জিয়াউল হক ইমন, চট্টগ্রাম
নির্বাচন কমিশনের বিধিমালার ঘেরাটোপের সুযোগে প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের হিড়িক পড়েছে আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে। নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধি অনুসারে প্রার্থীদের প্রচারণায় নানা বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মূলত মানা হচ্ছেনা। সাধারণ প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে আকার ও রঙের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম চট্টগ্রামের বড় দলের প্রার্থীদের মাঝে এই বাধ্যবাধকতা না মানার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচন বিধিমালা আইন ৭ এর ঙ ধারায় যে সকল শর্তাবলী দেয়া হয়েছে তাতে রঙ আকার প্রতীক এসবের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে, কিন্তু এই ব্যাখ্যার জটিলতার সুযোগে প্রার্থীরা কোন কোন ক্ষেত্রে বিধিমালা ভঙ্গ করেও আত্মপক্ষ সমর্থণের সুযোগ নিচ্ছে। কি আছে এই বিধিমালায় ?
এই বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারণার সময়কাল নিয়েও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিধিমালার ৭ (ক) ধারা অনুসারে নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না।
এছাড়া ৭ (খ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপচনশীল দ্রব্য যেমন রেক্সিন, পলিথিন বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি কোনো প্রচারপত্র, লিফলেট বা ব্যানার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
বিধিমালার ৭ (ঙ) ধারায় আরও বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যতীত অন্যান্য সব প্রচার সামগ্রী ে যেমন ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন অবশ্যই সাদা-কালো রঙের হতে হবে। ব্যানারের আয়তন সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল এ-ফোর সাইজের মধ্যে এবং ফেস্টুনের আয়তন অনধিক ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল বা ফেস্টুনে প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া ব্যানার ব্যবহারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি একটি স্পষ্টীকরণ নির্দেশনা জারি করেছে। ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, ‘হরাইজন্টাল (আনুভূমিক) কিংবা ভার্টিকাল (উলম্ব) যেভাবেই হোক না কেন, ব্যানারের মাপ অনধিক ১০ ফুট বাই ৪ ফুট হলেই তা ব্যবহার করা যাবে।’
কিন্তু কমিশনের এই শর্তের ব্যাখ্যার জটিলতার সুযোগ নিয়ে ভোটের মাঠে প্রার্থীরা এসব শর্ত মানছেন না। এই চিত্র ইসির নজরেও আসে। ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কিছু এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহারের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে, যা আচরণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ এই বিধিমালায় আরো বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে।
এদিকে মাঠ পর্যায়ে দেশ বর্তমানের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা প্রকাশ্য লঙ্ঘনের হিড়িক। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জ-সবখানেই ঝুলছে বিশাল আকৃতির রঙিন ব্যানার, চলছে উচ্চ শব্দে মাইকিং, রঙিন পোস্টার মোড়ানো গাড়িতে ভোট চাওয়ার মহড়া।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) আসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সাঁটানো হয়েছে বিশাল আকারের রঙিন ব্যানার। বিশেষ করে বহদ্দারহাট মোড়ে উড়াল সড়কের নিচে একসঙ্গে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু নাছের (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ (ধানের শীষ) ও ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ হাসানের (মোমবাতি) রঙিন ব্যানার। ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনীত এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের বড় ব্যানার সরাসরি চোখে না পড়লেও, রঙিন ব্যানারে মোড়ানো গাড়িতে করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা, শাপলা কলির প্রতীক ব্যবহার এবং উচ্চ শব্দে মাইকিং করতেও দেখা গেছে, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর ব্যক্তিগত মোবাইলে তার একান্ত সচিব আরিফ মুন্না দেশ বর্তমানকে জানান, একজন প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ৯ ফুট বাই ১৬ ফুট আয়তনের ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবেন। আমরা সেই হিসাবে বিলবোর্ড গুলো বসিয়েছি।’
একই অবস্থা চট্টগ্রাম-৯ আসনসহ নগরীর অন্যান্য আসনেও। সবগুলো আসনের সড়কে ও মোড়ে মোড়ে রঙিন ব্যানার ও বিলবোর্ড আকৃতির প্রচারণায় ছেয়ে আছে।
এদিকে দেরিতে হলেও শেষ মুহুর্তে কমিশনের উদ্যোগে এব্যাপারে অভিযানও শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। চট্টগ্রামের চিত্র নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন দেশ বর্তমানকে জানিয়েছেন বিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাদের শক্ত অবস্থানের কথা। তার মতে, যেখানে তারা অভিযোগ পাচ্ছেন বা তাদের নজড়ে আসছে সেখানেই অভিযান চালিয়ে এসব বিধি বহির্ভুত প্রচারণা অপসারণ করা হচ্ছে। তিনি এই প্রতিবেদকসহ সাংবাদিকদের এব্যপারে সহযোগিতা প্রত্যাশাও করেন।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ছয়জন প্রার্থী। বিএনপি, ইসলামী ফ্রন্ট, জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি রয়েছেন ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ এমদাদুল হক (আপেল) ও ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ নুরুল আলম (হাতপাখা)। এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৯ জন। এধরণের বিপুল ভোটার অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রচারণার এই বৈষম্য ও জৌলুস নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মত প্রকাশ করছেন অনেকেই।