চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম আগ্রাবাদ এলাকায় গতকাল শনিবার বিকেলে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট নাঈমুল ইসলাম। মোটরসাইকেলের ওপর বসে যানবাহন ও চালকদের কাগজপত্র পরীক্ষা করছিলেন তিনি। তাঁর বুক পকেটে ওয়াকিটকি ও কোমরে মামলা দেওয়ার যন্ত্র রয়েছে। এ দুটো ছাড়াও তার কাছে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ থাকার কথা। কিন্তু এ যন্ত্রটি তার কাছে দেখা যায়নি। কেন বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করছেন না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রচন্ড রোদের মধ্যে এমনিতেই বাঁচি না। তার ওপর কোমরে থাকে মামলার মেশিন, বুকে থাকে ওয়াকিটকি। আর কত বহন করবো এই শরীরে। এটা আসলে যখন প্রয়োজন পড়ে তখন ব্যবহার করি।’
শুধু আগ্রাবাদ মোড় নয়, চৌমুহনী, টাইগারপাস, ওয়াসা মোড়, লালখান বাজার ও কাজীর দেউড়ি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে কোথাও কোনও ট্রাফিক সার্জেন্টের শরীরে এই বিশেষ ক্যামেরা দেখা যায়নি।
২০২১ সালের ২৪ জুলাই বন্দর নগরীর রাস্তায় ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ চালু করে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এর আগে ঢাকা ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে এই ক্যামেরার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সিএমপি চারটি থানায় ২৮টি ক্যামেরা দিয়ে যাত্রা শুরু করে। তবে সিএমপির ১৬টি থানায় বর্তমানে ১০ থেকে ১৫টি করে ও ট্রাফিক বিভাগের চারটি জোনে ৫০ থেকে ৬০টি করে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ রয়েছে।
ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্যকারী যানবাহন ও চালক শনাক্ত, দুর্ঘটনা, সড়কে দায়িত্বরত পুলিশের অনিয়ম প্রতিরোধ ও তল্লাশি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ চালু করা হয়েছে। জিপিআরএস (তারবিহীন মোবাইল টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত এক ধরনের ব্যবস্থা) প্রযুক্তির মাধ্যমে যে কোনো স্থান থেকে ক্যামেরা দেখে পুলিশের কার্যক্রম নজরদারি করা হয়। ক্যামেরাটি দায়িত্বরত পুলিশের বুকে কিংবা কপালে লাগানো থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চীনে তৈরি জিও-পিআরও মডেলের প্রতিটি ক্যামেরার দাম ২০ হাজার টাকা। সম্পূর্ণ এইচডি ফরম্যাটে ১৬ মেগাপিক্সেলের এ ক্যামেরায় অডিও, ভিডিও এবং ছবি ক্যাপচার করা যায়। তবে এই ক্যামেরার ব্যাটারির চার্জ থাকে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা। দায়িত্বরত পুলিশের পক্ষে এই ক্যামেরার ফুটেজ ইচ্ছে করলেই মুছে ফেলার সুযোগ নেই।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ কর্মকর্তা) স্পিনা রানী প্রামাণিক জানান, নানা অসঙ্গতির চিত্র ধারণ করতে এ ক্যামেরা চালু করা হয়েছিল। সড়কে প্রায়ই যানবাহন চালক, পথচারী ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। পথচারী ও যানবাহন চালকরা আইন অমান্য করে থাকেন। আবার কখনও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এসব ক্ষেত্রে যাত্রী বা চালকের অভিযোগ থাকে পুলিশের বিরুদ্ধে। আবার পুলিশের অভিযোগ থাকে যাত্রী বা চালকের বিরুদ্ধে। অনেক সময় রাস্তায় দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটন করা যায় না। তাই সবগুলো বিষয় মনিটরিংয়ের জন্য প্রথমে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ চালু করা হয়।
কিন্তু প্রায় দুই বছরে এ ক্যামেরা দিয়ে নগরীর সড়কে কোনো যানবাহনের এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের অনিয়ম ও অসঙ্গতির ঘটনা ধরা পড়ার খবর জানা যায় নি। ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশ সদস্যদের এ ক্যামেরা ব্যবহার করতে তেমন দেখা যায় না। আবার ক্যামেরা থাকলেও তা সচল থাকে না।
কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ অভিযোগ করেছেন, ক্যামেরাগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। ব্যাটারির চার্জ দীর্ঘক্ষণ থাকে না। অপারেটিংয়ের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
টাইগারপাস এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী সার্জেন্ট মাসুদুল আলম দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘ক্যামেরার ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেছে। এটা অফিসে চার্জে দিয়ে এসেছি। এই ক্যামেরা ২-৩ ঘণ্টার বেশি ব্যাকআপ দেয় না। বারবার চার্জ দিতে খুব বিরক্ত লাগে।’
তবে কিছু কিছু পুলিশ সদস্য বিশেষায়িত এই ক্যামেরার ব্যবহার করে অনৈতিকতার আশ্রয় নিচ্ছেন বলে অভিযোগ মিলেছে।
অভিযোগ আছে, পুলিশ রাস্তায় আর্থিক লেনদেনের সময় ওই ক্যামেরা বন্ধ রাখে। আবার নিজের অপরাধ আড়াল করে কাউকে শায়েস্তা করতে সাধারণ নাগরিকের অজ্ঞাতে এই ক্যামেরা চালু করা হয়।
যানবাহনের কয়েকজন চালক অভিযোগ করেছেন, আগে পুলিশের কাছে যখন বডি ওর্ন ক্যামেরা ছিল না, তখন রাস্তায় গাড়ি থামিয়েই তারা টাকা দাবি করতেন। না হলে মামলা দেয়ার ভয় দেখাতেন। এখন ক্যামেরা থাকলেও তা বন্ধ করে তারপর টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না চাইলে ক্যামেরা চালু করে গাড়ির নম্বরসহ ভিডিও করেন। তখন আমরা মামলার ভয়ে টাকা দিয়ে দিতে বাধ্য হই।
ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগের ব্যাপারে সিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী বডি ওর্ন ক্যামেরার অপব্যবহার নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেননি।
সিএমপির উপ-কমিশনার (সদর) আবদুল ওয়ারিশ দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘নগরীর সবকটি থানায় ও ট্রাফিক বিভাগে এখন বডি ওর্ন ক্যামেরা রয়েছে। পুলিশদের যখন প্রয়োজন পড়ে তখন তারা এই ক্যামেরা ব্যবহার করে।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বডি ওর্ন ক্যামেরার অপব্যবহার নিয়ে কোনো ভুক্তভোগী আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।’
ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপ কমিশনার তারেক আহম্মেদ দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে আমরা অফিস থেকে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের কর্মকান্ড মনিটর করি। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের শরীরে যখন বডি ওর্ন ক্যামেরা চালু থাকে, স্বাভাবিকভাবেই তখন সেই ক্যামেরার সামনে যানবাহনের চালক কিংবা পথচারী অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে অনৈতিকতার অভিযোগ পেলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেবো।’