প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের শ্রমিক বাবার সন্তান হয়েও স্বপ্ন দেখেছেন বড় কিছু হওয়ার। সেই স্বপ্ন জয়ের পথে দারিদ্রতা বাধা হয়েছিল বারবার। কিন্তু সেসব বাধাকে অতিক্রম করে কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অবশেষে জয় করে নিয়েছেন কাক্সিক্ষত সাফল্য, হয়েছেন ৪১তম বিসিএস’র শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
মেহেদী হাছান আমজাদ। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের পশ্চিম রায়পুর গ্রামের সন্তান। উত্তর গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, উপকূলীয় আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ) ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ চুকিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন আনোয়ারা সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে। ধৈর্য্য,পরিশ্রম, একাগ্রতা, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে লেগে থাকলে যে সফলতা আসে সেটার প্রমাণ করে দিলেন তিনি। গ্রামের বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন এক বেসরকারি কলেজ থেকে পড়াশুনা করেও হাল না ছেড়ে, অন্যদের মত হতাশ না হয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করে যাওয়ার ফল আজকের এই সফলতা।
পিতা ফেরদৌস আলম পেশায় একজন শ্রমিক, মাতা হোসনেয়ারা বেগম গৃহিনী। নিম্নবিত্ত পরিবারেই বড় হয়েছেন মেহেদী হাছান আমজাদ। দেশ বর্তমানকে মেহেদী হাছান আমজাদ বলেন তার সাফ্যল্যের কথা।
তিনি বলেন, আর দশটা ছেলের মতোই আমার ছেলেবেলা কেটেছে দূরন্তপনায়। শ্রমিক বাবা, গৃহিণী মায়ের সাথেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কেটেছে। গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে শিখেছি। আর সেই সংগ্রামই আমাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।
সফল হতে হলে কোন বিষয়গুলো ত্যাগ করা উচিত বলে মনে হয়? এই প্রশ্নের জবাবে মেহেদি বলেন, বিসিএস অন্যান্য চাকরি মতোই একটা চাকরির পরীক্ষা। তবে অন্যান্য চাকরি মতো এখানে কম পরিশ্রমের সুযোগ নেই। কঠোর পরিশ্রম করা ছাড়া জীবনে কোনও কিছুই আসে না। অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। হয় আপনাকে সময় নষ্ট করে জীবন নষ্ট করতে হবে, না হয় জীবন সুন্দর করতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। দুটো কখনোই একসঙ্গে করা যাবে না। বিসিএস ক্যাডার হতে হলে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে। আপনাকে আমোদ-প্রমোদ করা ত্যাগ করতে হবে। জীবনে থেকে অনেক কিছু তাড়িয়ে দিতে হবে।
বিসিএস-এর জন্য পড়াশোনা ও প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মেহেদী হাছান আমজাদ বলেন, আমি প্রতিদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসতাম। সকালবেলা ইংরেজি আর ম্যাথ ভালো মনে থাকে। সকাল ৬টা থেকে শুরু করে ১০টা পর্যন্ত ইংরেজি আর ম্যাথ করতাম। এরপর নাস্তা করে ব্যক্তিগত কাজ সেরে ১২টার দিকে আবার টেবিলে বসতাম একটানা বিকেল ৫টা পর্যন্ত পড়তাম। কখনো রাত জেগে পড়াশোনা করিনি তবে নিয়মিত পড়েছি। যেহেতু ব্যাচেলর বাসায় থাকতাম, তাই পড়াশোনা ছাড়া পারিবারিক কিংবা বাহ্যিক চিন্তা মাথায় কমই আসত। তবে, সামাজিক কিংবা পারিবারিক বিপদে-আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করতাম। পড়াশোনা যেমন চালিয়ে যেতাম আবার নিজেকে সময় দেয়ার জন্য অনেক সময় শিথিল সময়ও কাটাতাম। আমি নোট করে পড়তাম-সর্বোচ্চ গুছিয়ে পড়ার চেষ্টা করতাম। গল্পের বই পড়ার অভ্যাস টুকটাক ছিল,পত্রিকা নিয়মিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নোট করে পড়তাম। পড়াশোনার পাশাপাশি বিনোদনের জন্য বড় ভাইদের সাথে কোয়ালিটি আড্ডা দিতাম।
অনুজদের পরার্মশ দিয়ে মেহেদি বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করেছি আনোয়ারা সরকারি কলেজে। আনোয়ারা কলেজের প্রতি আমার সব সময় আলাদা একটা টান কাজ করে। আমার স্নেহের ছোট ভাইদের পরামর্শ দেব- যদি জীবনে সফল হতে চাও, তবে ভাল লাগার কাজটি করুন এবং অনলাইনের চোবল থেকে বেরিয়ে আসুন। টিকটক, ম্যাসেঞ্জার, ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করুন, আসক্ত হলে স্মার্টফোন ছাড়ুন। বিসিএস-এর জন্য ১ম বর্ষ থেকেই উঠে পড়ে লেগে যাওয়ার দরকার নেই। একাডেমিক পড়াশোনার ফলাফলের অনেক মূল, অনার্স লাইফটা উপভোগ করুন। পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষা, নানা কো-কারিকুলার কাজের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূরাজনৈতিক গোলকধাঁধা পড়ার, বোঝার চেষ্টা করুন। দেশটাকে ঘুরে দেখুন, জীবনকে উপভোগ করুন আর নেতিবাচক দিক থেকে দূরে থাকুন।
তিনি আরও বলেন, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নিজের ভিত্তিটা শক্ত করতে হবে। ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ইংরেজি, ম্যাথ ও বাংলা ব্যাকরণে চোখ বুলিয়ে যাবে। অনেকে সাধারণ জ্ঞান নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করে, আসলে তা ঠিক নয়। কারণ অনেক সাধারণ জ্ঞান নতুন নতুন তথ্য নিয়ে আসে, প্রতিনিয়ত পাল্টায়। কিন্তু ম্যাথ, ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণ কিন্তু পাল্টায় না। ৪র্থ বর্ষে উঠে বা অনার্স শেষ করে এর প্রস্তুতি নেয়া যাবে। পারলে এক বা দুইটা টিউশনি করানো যেতে পারে চর্চার জন্য।
একটা কথাই বলব- সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই, সফলতার পথ কঠিন ও কাঁটাযুক্ত। যে এই পথ অতিক্রম করতে পারবে, সেই সাফল্যের স্বাদ পাবে।
সফল হতে হলে- পরিশ্রম, ত্যাগ আর আত্মবিশ্বাস বড় মূলধন। সেটাই করে দেখিয়েছেন মেহেদি হাছান আমজাদ।