চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলীতে ‘পাহাড়খেকো’ হিসেবে পরিচিত সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হওয়ার পরও তাকে গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। মামলা কাঁধে নিয়ে তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। কিন্তু তদন্তের অজুহাতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না।
বৃহস্পতিবার (১৮ মে ) রাতে নগরীর আকবর শাহ থানায় জসিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন অপু প্রধান নামের এক ফেরিওয়ালা। তিনি নগরীর পূর্ব ফিরোজ শাহ এলাকায় সিরামিকস, ক্রোকারিজ ও মুদি দোকানের পণ্য ফেরি করে বিক্রি করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বুধবার (১৭ মে) বিকেল ৫টার দিকে রাস্তার পাশে মালামাল বিক্রি করছিলেন ফেরিওয়ালা অপু। এ সময় কাউন্সিলর জসিম সেখানে গিয়ে ফেরিওয়ালাকে এলোপাতাড়ি চড় থাপ্পড়, কিল-ঘুষি মারতে থাকে এবং চিৎকার করে গালিগালাজ করে বলতে থাকে-‘কার পারমিশন নিয়ে আমার এলাকায় ব্যবসা করতেছস?’
জসিম ব্যবসা করতে হলে তার অনুমতি লাগবে এবং চাঁদা ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না বলেও হুমকি দেন। কাউন্সিলর জসিম কর্তৃক ফেরিওয়ালাকে মারধরের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একজন নিরীহ ফেরিওয়ালাকে নির্মমভাবে মারধরের ঘটনায় এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয়রা।
কিন্তু মামলা হওয়ার দুদিন পার হয়ে গেলেও আসামি কাউন্সিলর জসিমকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। জসিমকে গ্রেপ্তার না করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে খোদ প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
তারা বলছেন, জসিমের বিভিন্ন অপকর্মে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন। কিন্তু প্রশাসন রহস্যজনক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করছে না। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, জসিমের মাথার ওপর অদৃশ্য কোনো প্রভাবশালী মহলের ছায়া রয়েছে। যে কারণে তার কাছে প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়েছে।
পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আবছার মিয়া দেশ বর্তমানকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জসিমের কাছে কোটি কোটি টাকা আছে। এখন তো সবখানে টাকার খেলা চলছে। সে টাকা দিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলে। না হয় মামলা হওয়ার পরও পুলিশ তাকে কেন ধরবে না? সে তো এলাকায় প্রকাশ্যে বীরের মতো ঘোরাফেরা করছে। তাহলে কি প্রশাসন তার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে?’
স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলার কোনো পরোয়া করছেন না কাউন্সিলর জসিম। মামলা হওয়ার পরও তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। এমনকি শুক্রবার রাতে পূর্ব ফিরোজ শাহ এলাকায় সামাজিক একটি অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন।
জানতে চাইলে আকবর শাহ থানার ওসি মোহাম্মদ ওয়ালী উদ্দিন আকবর দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘মামলার অভিযোগ আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত ছাড়া তো আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। আমাদেরকে একটু সময় দেন।’
কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক। তিনি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী।
শনিবার (২০ মে) বিকেলে কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গত ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় নগরীর আকবর শাহ থানার বেলতলীঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়। সেই পাহাড় কাটার অভিযোগে কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম ও সিটি করপোরেশনের তিন প্রকৌশলীসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ১১ এপ্রিল আকবর শাহ থানায় মামলা দায়ের করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পাহাড়টি কেটে সড়ক নির্মাণ করছিল সিটি করপোরেশন। আর এ কাজের তত্ত¡াবধানে ছিলেন কাউন্সিলর জসিম। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর কেবল মামলা করে দায় সেরেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কাউন্সিলর জসিম চট্টগ্রাম পরিবেশ আদালত থেকে মামলাটির জামিন নিয়েছেন।
এর আগে ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর আকবর শাহ থানার লেকসিটি আবাসিক এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগে কাউন্সিলর জসিম ও তার স্ত্রীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। সেই মামলায়ও তারা জামিনে আছেন।
গত ২৬ জানুয়ারি আকবরশাহ এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটার চিত্র পরিদর্শনে গিয়ে হামলার শিকার হন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ ঘটনায় রিজওয়ানা হাসান বাদী হয়ে আকবরশাহ থানায় কাউন্সিলর জসিমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু মামলা দায়েরের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আসেন কাউন্সিলর জসিম। একের পর এক মামলা করেও নানা অপকর্মে লিপ্ত এই জনপ্রতিনিধিকে দমাতে পারছে না প্রশাসন।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে মাত্র আড়াই হাজার টাকা বেতনে ইস্পাহানি মিলস লিমিটেড নামের একটি কারখানায় সুপারভাইজার পদে চাকরি করতেন কাউন্সিলর জসিম। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর চাকরি ছেড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাÐের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যেন আলাদীনের চেরাগ পেয়ে যান! নানা অপকর্ম করে ৮ বছরে কামিয়েছেন শত শত কোটি টাকা।