‘পতনযাত্রা’য় বিএনপি!

* চেয়ারম্যান অনুপস্থিত, মহাসচিব কারাগারে, জ্যেষ্ঠ নেতারা পলাতক * মৃদু গতিতে আন্দোলন চালানোর নেতাও অবশিষ্ট নেই * অবরোধের নেতৃত্ব দেবে কে- প্রশ্ন ওবায়দুল কাদেরের

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ২৮ অক্টোবর শুরু হবে একদফা আন্দোলনের মহাযাত্রা। পাল্টা জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির মহাযাত্রা পরিণত হবে পতনযাত্রায়। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মহাসমাবেশের দিন বলেন, বিএনপির মহাযাত্রা এখন মরণযাত্রায় রূপান্তরিত হয়েছে। রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপির মহাযাত্রা কি সত্যিই পতনযাত্রা বা মরণযাত্রায় পরিণত হল? দলের চেয়ারম্যান সশরীরে অনুপস্থিত, সেকেন্ডম্যান মহাসচিব কারাগারে, জ্যেষ্ঠ নেতারা গ্রেপ্তার এড়াতে একপ্রকার পলাতক- সবমিলিয়ে আন্দোলনের যাত্রা মৃদু গতিতে চালানোর নেতৃত্ব দেওয়ার লোকও অবশিষ্ট নেই। থমকে যাওয়ার এমন বাস্তবতা আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রেক্ষাপট বলছে, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা- এসব ক্ষেত্রে এ মুহূর্তে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় চরিত্রে। হরতালের দিনে মহাসচিব গ্রেপ্তার হলে সেদিন রাতে তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি, যা আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে। এই কর্মসূচি পালন বা আগামী দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দলের ‘সেনাপতি’র অনুপস্থিতি সবকিছু স্থবির করে দিতে পারে। ইতোমধ্যে গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এক বক্তব্যে প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপির অবরোধের নেতৃত্ব দেবে কে?
সপ্তাহ দুয়েক আগে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৮ অক্টোবরের সমাবেশ থেকে দুর্গাপূজার জন্য দশ দিনের বিরতি ও ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরপরই, ঢাকায় ১০ লাখ লোকের সমাগম, সচিবালয়-গণভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘেরাও, রাজধানীর প্রবেশমুখে অবরোধসহ আন্দোলনের নানা পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমে আসে। মূলত, কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়া ঠেকাতে ২৮ অক্টোবরের আগেই সরকার দাবি মেনে নেবে, এমন প্রত্যাশা থেকে সামনের পরিকল্পনার আওয়াজ দিচ্ছিল দলটি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে সেসবের পাত্তা না দিলেও পথ খুঁজছিল বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার।
বিএনপি বারবার বলে আসছিল, তারা কোন ধরনের সহিংসতা-নাশকতা করবে না। তাদের আন্দোলনের সকল কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা করতে দলীয় লোক বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করলে তা আওয়ামী লীগকে বিশ^ দরবারে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরবে। বদনাম এড়িয়ে বিএনপিকে মোকাবেলা করা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসে। তবে, আওয়ামী লীগের সেই দুশ্চিন্তা দূর করতে বিএনপির সহিংস ভূমিকাই সহায়ক হল। নেতা-কর্মীদের সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষ ও দলের শান্তিপ্রিয় লোকদের সমর্থনও হারিয়েছে দলটি।
যদিও, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্দোলনের শুরুতেই বিএনপির এই হোচট খাওয়াকে ‘আওয়ামী লীগের ফাঁদে পা’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের মতে, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ঘোষণা আওয়ামী লীগকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু, রাজনৈতিক অপকৌশল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিয়েছে তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে উসকানি দিয়েছে। দলটির নেতা-কর্মী সেই ফাঁদে পা দিয়ে উত্তেজিত হলে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
২৮ অক্টোবরে ফিরে গেলে দেখা যায়, দেশব্যাপী পুরানো মামলায় নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, ঢাকায় প্রবেশে পথে পথে বাধা-প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ আসে বিএনপির পক্ষ থেকে। এর মধ্যেও মহাসমাবেশের আগের রাতে বিপুল সংখ্যক লোকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রাত্রিযাপন এবং দুপুর ২টার সমাবেশস্থল সকালেই কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া বিএনপির প্রতি নেতা-কর্মীদের দৃঢ় আন্তরিকতা প্রকাশ করে। নিঃসন্দেহে বিএনপির জমায়েত ছিল বেশ বড়। সহিংসতায় জড়াবে- আগে থেকেই এমন চিন্তা বিএনপির ছিল কি-না তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে, মহাসমাবেশ চলাকালে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপি- উভয়েরই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নেতা-কর্মীরা গণ্ডগোল শুরু করলে বিএনপির পক্ষ থেকে তখনও মাইকে শান্তি বজায় রেখে বক্তব্য শোনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিবেশ ঘোলাটে হয়ে যায়। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, আগুন লাগানো বিএনপির সহিংস রূপ প্রকাশ করে। ফলে, আত্মরক্ষা ও সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাল্টা অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি’ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ফলস্বরূপ, আন্দোলনের মহাযাত্রা শুরুর পরের দিনই নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতায় বলা পতনযাত্রা বা মরণযাত্রার বাস্তবিক রূপ নিয়েছে বিএনপির আন্দোলন।