নির্বাচন হবেই: প্রধানমন্ত্রী
* এ সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার * জনগণের ধিক্কার ছাড়া বিএনপির কপালে কিছু জুটবে না * ট্রাম্প-বাইডেন যেদিন বৈঠক, সেদিন আমরাও বৈঠক করব * বিএনপি সন্ত্রাসী দল, তাদের ছাড় দেয়া হবে না # মজুতদারদের ধরার নির্দেশনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে এবং সেটা যথা সময়েই হবে। কারো চোখ রাঙানো পরোয়া করি না। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। গ্লোবাল গেটওয়ে ফোরামে যোগদান উপলক্ষে সম্প্রতি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে তিনদিনের সরকারি সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার ছোট হবে নাকি বড় সেটা এখনি বলা যাবে না। তবে এটা বলতে পারি নিয়ম মেনেই নির্বাচন হবে। তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থী চূড়ান্ত হলে কোন মন্ত্রী সরকারি সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে না। নির্বাচন নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই করতে হবে। মন্ত্রণালয় কমিয়ে দিলে কাজের ব্যাঘাত ঘটে, যেহেতু আমি উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাই, সেহেতু বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। বিশে^র অন্যান্য দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবেই আমাদের দেশেও হবে বলে সাংবাদিকদের জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, নির্বাচন হবেই। কোনো সহিংসতা করে লাভ হবে না। ২০১৩ সালে পারে নাই, ২০১৮ সালেও পারে নাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ভোট ও ভাতের অধিকার আদায় করেছি। এরপর বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে যে দেশের উন্নয়ন হয়, এটি আপনারাও বিশ্বাস করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ১৪ বছরে বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে। শুধু মেট্রোরেল, টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস নয়, আপনারা সারা বাংলাদেশে ঘুরে দেখে আসুন। গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে আসুন।
বিএনপিকে জনগণ ধিক্কার দেবে: জনগণের ধিক্কার ছাড়া বিএনপির কপালে আর কিছু জুটবে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিএনপি যে সন্ত্রাসী দল, এটা তারা আবার প্রমাণ করল। কানাডা কোর্ট এই বিষয়টি কয়েকবার বলেছে। তিনি বলেন, মাঝখানে তারা (বিএনপি) কিছুটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করছিল। আমাদের সরকার তাদের কোনো বাধাও দেয়নি। তাদের ওপর একটি শর্ত ছিল তারা যেন অগ্নিসন্ত্রাস-ভাঙচুর, এগুলো না করে। তারা যখন সুস্থ রাজনৈতিক কর্মসূচি করছিল, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও ধীরে ধীরে অর্জন করতে শুরু করেছিল। কিন্তু ২৮ তারিখে তাদের যেই ঘটনা, বিএনপির যে সমস্ত ঘটনা ঘটালো, বিশেষ করে মাটিতে ফেলে পুলিশকে যেভাবে কোপালো, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, এই ঘটনার পরে জনগণের ধিক্কার ছাড়া, বিএনপির আর কিছু জুটবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স পুড়িয়েছে, সেখানেও পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে। আজকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনির ওপর যেভাবে হামলা করছে, এখানে হাসপাতালে বোমা হামলা করল, নারী শিশুদের অত্যাচার করেছে, তাদের সবকিছু বন্ধ করে রেখে দিয়েছে, আমি তফাত কিছু দেখতে পারছি না। আমরা এর নিন্দা জানাই।
বিএনপিকে আর কোন ছাড় নয়: বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি সন্ত্রাসী সংগঠন। সন্ত্রাসীদের কীভাবে শিক্ষা দিতে হবে এবং সেই শিক্ষাটা দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। সেটাই আমরা দেবো। এদের জন্য দেশটা ধ্বংস হোক, এটা সহ্য করা যাবে না। বিএনপি-জামায়াতের নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সন্ত্রাসী এবং বিএনপি যে সন্ত্রাসী দল, সেটা আবার প্রমাণ করলো। কানাডার আদালত এ বিষয়টি কয়েকবার বলেছে। সন্ত্রাসী দল হিসেবে তাদের কর্মীরা কানাডায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এদের মধ্যে কোনও মনুষ্যত্ববোধ নেই। তাদের সঙ্গে যতই ভালো ব্যবহার করি না কেন, এদের স্বভাব বদলাবে না। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদে এরা বিশ্বাস করে। অবৈধ ক্ষমতাটাই এরা ভালো বোঝে। তিনি আরও বলেন, আর এরা নির্বাচন চায় না। এরা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। শেখ হাসিনা বলেন, আমি চট্টগ্রামে যখন বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করছি, তখন তারা ঢাকায় মানুষের ওপর হামলা করছে। পুলিশের ওপর হামলা করছে। মানুষ খুন করছে। তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর সাংবাদিক। গতকালও লালমনিরহাটে যুবলীগের একজনকে পুড়িয়েছে। এভাবে হত্যা করা, মানুষের সম্পদ নষ্ট করার কর্মকাণ্ডই তো তাদের চরিত্র। সাংবাদিকরা তো তাদের পক্ষে ভালো ভালো নিউজ দেয়, টক শোতে সরকারের দোষটাই বেশি দেখে। তাহলে তাদের এত রাগটা কেন সাংবাদিকদের ওপর? সব জায়গায় তাদের নিউজ সবার আগে। আমার নিউজ সবার পরে। কোথাও কোথাও চার-পাঁচ নম্বরেও থাকে। তারপরও কেন তাদের রাগটা? সাংবাদিকদের চিকিৎসার বিষয়টি সরকার দেখবে বলেও জানান তিনি। যাদের বাস পুড়েছে, তাদেরটা সরকার দেখবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যেসব গাড়ি পুড়িয়েছে, তাদের সহায়তা দেয়া হবে।
খুনিদের সঙ্গে সংলাপ নয়: বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও খুনিদের দল আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা পুলিশ খুন করেছে, বাসে আগুন দিয়েছে তাদের সঙ্গে কীসের আলাপ, কীসের বৈঠক? বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি জনগণও চায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটা আমাদের দেশ, রক্ত দিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। এখানে তো খুনিদের ডায়ালগ করার প্রশ্নই আসে না। সাংবাদিকদের প্রতি বিএনপি-জামায়াতের হামলার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২৮ তারিখে ৪০/৪৫ জন সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করা হলো। রিপোর্টারস উইথআউট বর্ডার, এদের কাছ থেকে আপনারা কী কোনো সিমপ্যাথি পেয়েছেন? তাদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পেয়েছেন। আজকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো চুপ কেন? তাদের কাছ থেকে প্রতিবাদ শুনি না কেন, তাদের কাছ থেকে কথা শুনি না কেন? আপনারা সেটি জিজ্ঞাসা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি পুলিশ মারল। বাসে আগুন দিলো। যারা মানবাধিকারের কথা বলেন, আজকে তাদের সেই ভাণ্ডার বন্ধ কেন? তারা চুপ কেন?
ট্রাম্প-বাইডেন যেদিন বৈঠক, সেদিন আমরাও বৈঠক করব: আমেরিকায় ট্রাম্প-বাইডেন যেদিন বৈঠক করবে সেদিন আমরাও বৈঠক করব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের একটা সুনির্দিষ্ট সঙ্ঘা আছে। বিরোধী দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকতে হয়। বিএনপি’র সে প্রতিনিধিত্ব আছে? মার্কিনীদের আপনারা প্রশ্ন করেন না কেন, তারা কি ট্রাম্পকে বিরোধী দল ভাবে? জো বাইডেন যেদিন ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করবেন, সেদিন আমরাও বৈঠক করবো বলে সাংবাদিকদের জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল হাসান সারওয়ার্দীকে ছাড়া হচ্ছে না। তাকে ছাড়াও হবে না। আমি ইতোমধ্যে নিদের্শ দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেই কথিত উপদেষ্টা জাহিদুল ইসলাম মিয়া ওরফে আরেফিকেও ছাড়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিকে (জাহিদুল ইসলাম মিয়া) জিজ্ঞাসা করা হবে। তাকে ছাড়া হচ্ছে না, ছাড়া হবেও না।
যারা মজুত করে তাদেরকেও ধরা হবে: বর্ষাকালে মুরগি এমনি একটু কম ডিম পাড়ে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিছুদিন আগে ডিমের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এ মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, এই ডিমের দাম নিয়েও চিৎকার। এরপর যখন বললাম, আমদানি করব, আমদানি আর করা লাগেনি। তার আগেই গেল দাম কমে। এখন আবার আলুর দাম বৃদ্ধিতে বাণিজ্যমন্ত্রী বলছে যে, আলুও আমরা আমদানি করব। পচাবে তারপরও দাম কমাবে না। এটা তো ঠিক না। সেজন্য আমি বলেছি, দোকানে দোকানে না, যারা এগুলো মজুত করে তাদেরকে ধরতে হবে। ইতোমধ্যে আমি সেই নির্দেশই দিয়েছি এবং সেটাই করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের আমন্ত্রণে গত ২৪ অক্টোবর ব্রাসেলসে যান শেখ হাসিনা। সফরকালে সাইডলাইনে ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন। সফর শেষে ২৭ অক্টোবর ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২৫ অক্টোবর সকালে তিনি ইসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইউরোপীয় কমিশন ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর একটি অনুদান চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ইসির মধ্যে একটি ১২ মিলিয়ন ইউরোর অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া এই সফরে বাংলাদেশ সরকার এবং ইসি বাংলাদেশের সামাজিক খাতে ৭০ মিলিয়ন ইউরোর পাঁচটি ভিন্ন অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।