আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রচারে বাধা, ক্যাম্প ও গাড়ি ভাঙচুর, ভয়-ভীতি দেখানো অভিযোগ বেশি। এমনকি ভোটে মাঠের সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের অভিযোগও জমা পড়েছে ইসিতে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়ে সাড়া পাচ্ছেন না। ক্ষমতা থাকলেও কমিশন আবেদনকারীদের বলছে, এসব বিষয়ে প্রতিকার পেতে হলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে।
তবে কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচন পরিচালনাবিধির ৯০ ধারায় বলা আছে, সন্তোষজনক মনে না হলে কমিশন নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে। হামলাকারীদের প্রার্থীতা বাতিল করার ক্ষমতাও দেওয়া আছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কমিশন ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় একজন যুগ্ম জেলা জজের অধীনে একটি করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করার কথা বলা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এ কারণে প্রার্থীরা সাধারণত এই আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করেন না।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের এখন পর্যন্ত ২১১টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ৯১ জন। আবার তাদের মধ্যে ৫২ জনই বর্তমান সংসদ সদস্য। ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত ৭ দিনে ৩৬টি স্থানে হামলা ও সংঘর্ষ হয়েছে। বেশির ভাগ জায়গায় হামলা হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মীদের ওপর। আওয়ামী লীগের যেসব প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫২ জন বর্তমান সংসদ সদস্য। এ ছাড়া ২৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির ৯ প্রার্থীকেও শোকজ করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে জেল-জরিমানার পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা করা হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য এখন মাঠে আছেন প্রায় ৮০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ছাড়া ভোটপূর্ব অনিয়ম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য জুডিশিয়াল (বিচারিক) ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে প্রতিটি আসনে একটি করে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি রয়েছে। তারাও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। তবে তারা নিজেরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমিটিগুলো ইসিকে সুপারিশ করতে পারে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে জেল-জরিমানার পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং রাজনৈতিক দল কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান আছে। মূলত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এটি করে থাকেন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি মাঠে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দুএকটি ক্ষেত্রে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যে চারজনকে সতর্ক করা হয়েছিল, তারা হলেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, ঢাকা-১৯ আসনের প্রার্থী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান, মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী মৃণাল কান্তি দাশ ও গাজীপুর-৫ আসনের প্রার্থী মেহের আফরোজ।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, এখন পর্যন্ত বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির ১২০টির বেশি প্রতিবেদন ইসি পেয়েছে। প্রথমবার যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, তাদের সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু প্রার্থীকে ইসিতে তলব করা হবে।
একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠার পর কুমিল্লা-৬ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ ক ম বাহাউদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে অনুসন্ধান কমিটি। গত বুধবার এই সংসদ সদস্যের নির্দেশে তার অনুসারীরা বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চয়ন ইসলামকেও আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় সশরীর অনুসন্ধান কমিটির সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ইসি অনেক কিছুই করতে পারে। যেসব প্রার্থী বারবার আচরণবিধি লঙ্ঘন করবেন, তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা উচিত।
এ ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে সভা করেছি। তাদের কাছ থেকে খুব বেশি অভিযোগ পাইনি। প্রশাসনের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পোস্টার ছেঁড়া এগুলো হয়েছে। কিন্তু মোটাদাগে খুব বেশি ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয় না। তবে সহিংসতা একেবারেই হয়নি, সেটা বলছিনা।