নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ, ষড়যন্ত্র

দেশে দেশে নির্বাচন আয়োজন বরাবরই একটা চ্যালেঞ্জের। একটা নির্বাচনকে ঘিরে নানা মহলের যোগাযোগ গড়ে উঠে। তার উপর সরকার ও বিরোধীপক্ষের নানা হিসাব নিকাশে নির্বাচন চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়। মাঠের বিরোধীদল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন রাজপথে রয়েছে। তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগি ও বাংলাদেশের বড় বড় মুরুব্বী দেশগুলোর নেতাদের সাথে দেখা করে কিংবা বিদেশিরা দেশে এসে বিরোধীদের সাথে নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। তবে বিএনপি এবার আন্দোলনের কৌশল পাল্টে নিয়েছে। জ্বালাও পোড়াওয়ের বাইরে এসে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ মনে করছেন খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তিনি শুধু চ্যালেঞ্জের নয়, সন্দেহ করছেন নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এজন্য গতকাল সোমবার গণভবনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, দেশে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশ আছে বলেই কিন্তু আজকে বাংলাদেশের এই উন্নতিটা সম্ভব হয়েছে। ‘আগামী নির্বাচন..এই নির্বাচনটাও একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ নানা ধরণের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র হয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর বাংলাদেশের মানুষের জীবন যখনই একটু উন্নত হয় তখনই এই বাংলাদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার আছে, যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সব জায়গায় বদনাম করে বেড়ায়, মিথ্যা বলে বেড়ায়।

‘তারা আছে। তাদের আওলাদ-বুনিয়াদ আছে। এরাই কিন্তু বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেই যাচ্ছে।’

এ সময় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন,২০০১ সালের কারচুপির নির্বাচন ও এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার তৈরির ইতিহাস তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রের হত্যাকারী।

‘যারা মিলিটারি ডিক্টেটরের হাতে তৈরি করা দল, তাদের মুখে গণতন্ত্রের ছবক শুনতে হয়, ভোটের কথা শুনতে হয়। ভোট চুরি করাই যাদের অভ্যাস, সেই চোরদের কাছ থেকে বাংলাদেশের জনগণ কী শুনবে, কী দেখবে?’

গত ডিসেম্বর থেকে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরা রাজপথে আন্দোলনে রয়েছে। তারা বিদেশিদের পরামর্শে হোক তাদের নিজের চিন্তা থেকে হোক চলমান আন্দোলনের কৌশল পাল্টে নিয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীই পালন করে তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানানোর কাজ অব্যহত রেখেছে। এরমধ্যে পৃথিবীর শক্তিধর দেশ আমেরিকার সরকার কয়েকদফা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। প্রথমে র‌্যাবের উপর। তারপর সুষ্ঠু নির্বাচনের যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদের ভিসা দেয়া হবে না এমন হুমকি এসেছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের এসব নিষেধাজ্ঞাকে কোন পাত্তাই দিতে চান না। তিনি গত পরশু দলের এক সভায় বেশ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ২০ ঘণ্টার জার্নি করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হবে কেন, আমরা অন্য মহাদেশে যাবো।

প্রধানন্ত্রীর এ বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিএনপির বিদেশ বিষয়ক উইংয়ের প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক করে সাংবাদিকদের জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ঐ বক্তব্য ব্যক্তিগত। তিনি দেশের মানুষের সবার দায়িত্ব নিতে পারেন না।

এদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের এক সভায় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতিকে দুরভিসন্ধিমূলক বলে মন্তব্য করে বলেন ১৪ দলীয় জোট মনে করে, এ ভিসা নীতি অনাকাঙ্ক্ষিত, যা কারও পক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গত ২৪ মে এক বিবৃতিতে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেন। নতুন এই নীতির আওতায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার কথা বলা হয়।

মার্কিন সরকারের এ ভিসানীতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। ভিসা নীতির ঘোষণা দেওয়ার পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত অঙ্গীকারের প্রতি জোরালো সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা করেছে সরকার।

নেতৃবৃন্দ বলেন,আমরা একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো হস্তক্ষেপ আমরা কামনা করি না।’
১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেন, ‘আমরা মনে করি, যারা নির্বাচনকে বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে বানচাল করতে চায়, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তাদের জন্য এটা (ভিসা নীত) সহায়ক হতে পারে। সেই দিকে লক্ষ রেখে আমরা কথাগুলো বলতে চাই।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য বলেন, ‘এখানে যদি অন্য কোনো দেশের সন্দেহ থাকে, তাহলে তারা বসে এটা ঠিক করতে পারে যে সংবিধানের ভেতরে কোথায় কোনো ফাঁকফোকর আছে, সেটা তারা বিবেচনা করুক। সেগুলো দেখুক, আলোচনা করুক। কিন্তু সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হতে হবে। দেশে এ ধারাটা অব্যাহত রাখার জন্য। সংবিধানে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, অন্য কোনো উপায়ে আঘাত আসুক, এটা আমরা চাই না।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগে সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দেখতে দেখতে বিএনপির আন্দোলনের ১৪ বছর শেষ। ১৫ বছরে পা দিয়েছে। তারা প্রতিদিন ক্ষমতায় যাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখে। আমেরিকার কাছে, ইউরোপের কাছে রোজ-রোজ নালিশ করেও কোনো কাজ হয়নি। নালিশ করে তারা পেয়েছে ঘোড়ার ডিম। মরা গাঙ্গে জোয়ার আসে না। তাদের সঙ্গে দেশের মানুষ নেই। বিএনপির প্রত্যেক নেতার প্রধান অপকর্ম হলো মিথ্যাচার। মিথ্যাকে পুঁজি করে তারা শেখ হাসিনার সমালোচনা করে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়।’

এদিকে সম্প্রতি ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির তিন নেতা। বৈঠকের ব্যাপারে মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র ব্রায়ান জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের এবং একটি অহিংস রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। পরে মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং অহিংস রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নানা মহলের খবরদারি চলছে। সরকার ও বিরোধী পক্ষ যার যার পক্ষের লোকজনের সাথে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। যার যেখানে সুবিধা মনে হচ্ছে সেখানে যাচ্ছেন। এসব ঘিরে নির্বাচন আয়োজন সত্যি একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এমএফ