নির্বাচনী প্রশাসন সাজাচ্ছে সরকার

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুকিপূর্ণ মনে করছে আওয়ামী লীগ সরকার। কূটনৈতিকদের অতি উৎসাহী মনোভাবের কারণে বিগত নির্বাচনের মতো এবারকার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াকে চ্যলেঞ্জিং মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররাও এবারের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছেন, গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মনে করছেন বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র ভারত-রাশিয়াও।

এরই মধ্যে ঢাকা-মস্কোর দূতাবাসের পাল্টাপাল্টি টুইটও এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তো একের পর এক স্যংসন দিয়েই যাচ্ছে। সবদিক বিবেচনায় নিয়েই সরকারও আটগাঁট বেঁধে নেমেছে নির্বাচনী প্রশাসনকে ঢেলে সাজতে। এরই অংশ হিসেবে জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল ও পদন্নোতির হিড়িক পড়েছে। কিন্তু বিরোধীরা দেখছেন বাঁকা চোখে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। মাঠের সবচেয়ে সক্রিয় দল বিএনপির দাবি-দাওয়া নিয়ে বিদেশিরা কিছু বলেনি বলেও জানিয়েছেন তিনি। বিএনপি সে দাবি উপেক্ষা করে বিভিন্ন দূতাবাসে লবিং-তদবির শুরু করছেন অনেক আগে থেকেই। যদিও দলটি বলছে তারা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সংবিধান থেকে সরতে নারাজ। তাই নির্বাচন কীভাবে হচ্ছে সেটা সময়েই বলে দেবে।

তবে শেষ মুহুর্তে বিদেশিরা যদি কোনো চাপ প্রয়োগ করে বা সরকারে কোনো ছাড় দিতে হয় সেসময় অত্যন্ত গুরুত্ব হয়ে উঠবে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাই সেই প্রস্তুতি হিসেবেই আওয়ামী লীগ আগে থেকেই প্রশাসনকে গুছিয়ে রাখছেন বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও নির্বাচনের আগে প্রশাসনে রদবদল নতুন কিছু নয়। অতীতেও নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসন পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার কৌশলগত দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ধরনের ফাঁদ পাতার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে বিরোধীদগুলোর রাজপথের আন্দোলন, অন্যদিকে প্রশাসনের ভেতরের একটি অংশের ষড়যন্ত্র সরকারকে চাপে ফেলতে পারে। এ ধরনের ষড়যন্ত্র যাতে সফল হতে না পারে, সে জন্য সরকার যথেষ্ট সচেতন রয়েছে এবং প্রশাসনের কয়েকটি পর্যায়ে রদবদলের করে চাপমুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও ইউএনও, ডিসিসহ সচিব পর্যায়েও রদবদল দেখা গেছে।

একটি সূত্র জানায়, সাতশ’ কর্মকর্তার পদোন্নতি দিতে চাইছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি প্রস্তাবনা গেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এ নিয়ে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। বিষয়টিতে কারিগরি মতামত নেয়া ও বাস্তবায়ন করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ একটি কমিটি করেছে। দ্রুতই এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে ৭ জন ডিআইজিসহ ২২ জন পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। শিগগিরই আরও ১৫ জেলায় এসপিরা রদবদল হতে পারে। গত ১১ই জুন পদোন্নতি দেয়া হয়েছে আরও ৮ জন ডিআইজি’র। নির্বাচনের বাকি আছে আর মাত্র ৬ মাস। যাদের জেলায় পদায়ন করা হয়েছে ৪ ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে তাদের জেলার এসপি পদে পদায়ন করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ এবং ৪টি সরকারি সংস্থার রিপোর্টের প্রেক্ষিতে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড পাবলিসিটি) মো. মুনজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ‘পদোন্নতির বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিটিং হয়েছে। আর রদবদলের বিষয়টি নিয়মিত ও চলমান বিষয়।’

সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পদোন্নতির জন্য যাদের ইনসুটি (চলতি দায়িত্ব) পদায়নের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫০ জনই অতিরিক্ত আইজিপি। এরমধ্যে গ্রেড-১ পদর্মযাদায় ১৬, গ্রেড-২ পদর্মযাদায় ৩৪ জন র্কমর্কতা রয়েছেন। রয়েছেন ১৫৭ জন ডিআইজি ও ২৬৬ জন অতিরিক্ত ডিআইজি। এ ছাড়াও ২২৭ জন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন। প্রস্তাবটি পাস হলে পুলিশ সদর দপ্তরে ৬ জন অতিরিক্ত আইজিপিকে গ্রেড-১ পদমর্যাদায় ইনসুটি পদায়ন করা হবে।

সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার ৭ জন ডিআইজিসহ যে ২২ জন এসপিকে বদলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই এর আগে জেলায় এসপির দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও পদোন্নতি পাওয়া ৮ জন ডিআইজিকে রাজশাহী রেঞ্জ, রাজশাহী মহানগর কমিশনার, রংপুর রেঞ্জ, ময়মনসিংহ রেঞ্জ, বরিশাল রেঞ্জ, সিলেট মহানগর কমিশনার, খুলনা মহানগর কমিশনার ও খুলনা রেঞ্জে দেয়ার পরিকল্পনা আছে পুলিশ সদর দপ্তরের। যারা সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআইজিরা আছেন তাদের কাউকে পুলিশ দপ্তর ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পদায়ন করা হবে।  এ ছাড়াও শিগগিরই আরও ১৫ জেলার পুলিশ সুপার পদায়ন করা হবে।

সূত্র জানায়, যে ২২ জন এসপি রদবদল করা হয়েছে এরমধ্যে ১৩টি জেলায় একেবারে নতুন এসপি দেয়া হয়েছে। বাকি ৯ জন এক জেলা থেকে আরেক জেলা গেছেন কেউ গেছেন অন্য বিভাগে। গত বছর যে, ৩৮ জন এসপি বদলি করা হয়েছিল সেই ৩৮ জনের মধ্যে অনেকেই এর আগে এসপি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এদিকে গত শুক্রবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একটি প্রজ্ঞাপনে ১১৩ যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘এসব কর্মকর্তাকে সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি প্রদানপ‚র্বক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) নিয়োগ করা হলো।’ দ্বিতীয় আর একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দ‚তাবাসে কর্মরত যুগ্মসচিব পর্যায়ের আরেকজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, সরকার চায়, নির্বাচনকালীন সরকারে আজ্ঞাবহ কর্মকর্তারাই গুরুত্বপ‚র্ণ পদে থাকুক। কয়েকদিনের মধ্যে আরও বেশ কিছু পদে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে বলেও জানা গেছে। এ রদবদলের ক্ষেত্রে সরকার সমর্থক কর্মকর্তাদের দেয়া হতে পারে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং।

নির্বাচন কেন্দ্রিক এ ধরনের পরিবর্তনকে ভালো চোখে দেখছেন না সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মনে করেন নির্বাচনের আগে এ ধরনের রদবদল সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, এখনো আওয়ামী লীগের অধীন নির্বাচন হলে যেভাবে আমলা-পুলিশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, এতে কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে না। তাদের তাড়াতে হবে। বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগের অধীন নির্বাচনে যাব না। বিএনপিকে বলতে হবে, নির্বাচন করতে দেব না।

শুক্রবার (১৬ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট আয়োজিত ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও সংবাদপত্র’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বদরুদ্দীন উমর এসব কথা বলেন। ।

সভায় বদরুদ্দীন উমর আরো বলেন, ‘আসলে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না, এই আওয়াজ তুলতে হবে। বলতে হবে যে নির্বাচন করতে দেব না। নির্বাচনের আগে থেকে আওয়াজ তুলব, জনগণকে সংগঠিত করব এবং জনগণ নিয়ে সব নির্বাচনী কেন্দ্র ঘেরাও করব, নির্বাচন হতে দেব না এভাবে বলতে হবে। না হলে নির্বাচন করব না বলে বসে থাকলে আওয়ামী লীগ আগের মতোই নির্বাচন করে বসে যাবে।’

এদিকে গত বৃহস্পতিবার (১৫ জুন ) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন,নির্বাচনে আবারও কারচুপি করতে সরকার এখন থেকেই প্রশাসন সাজাচ্ছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন কিন্তু শুরু করে দিয়েছে। আরেকটি কারচুপির নির্বাচন। পত্রিকায় এসেছে, পুলিশের ব্যাপক রদবদল, ব্যাপক পদোন্নতি। সচিবদেরও রদবদল, অর্থাৎ প্রশাসনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। একটাই উদ্দেশ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা তাদের মতো করে সব কিছু সাজিয়ে ত্লুছে। আজীবন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করে অতীতে বাকশালও করেছিলেন, কিন্তু পারেননি।