নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এ নিয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যে চলছে রাজনৈতিক লড়াই। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হোক। এবং এই সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা এও বলছেন, বিএনপি ২০১৪ সালে সংসদে ছিল বলেই নির্বাচনকালীন সরকারে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এবার তারা সংসদে নেই, তাই তাদের প্রস্তাব দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রশ্নই ওঠে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে এবার কোনো আপস করা হবে না। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্য হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে।
এদিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে গঠন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে কূটনীতিকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করছে। সম্প্রতি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি দেশের রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংসদে যেসব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব আছে, তাদের নিয়ে নির্বাচনকালে একটি ছোট সরকার গঠন করবেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার জন্য তার কাজ করবে। আর সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিয়ে দৈনন্দিন কাজ করবে।
আনিসুল হক বলেন, এর আগে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান সরকারই আগামী নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তো আন্তর্জাতিকভাবে কারো সমর্থন পায়নি। তাই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে। তারা যে সমস্ত দেশের হাতে পায়ে ধরে, সে সকল দেশে যেভাবে চলতি সরকার নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, আমাদের দেশেও ঠিক তাই হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে বিশ্বের কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রস্তাব পায়নি। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংলাপের জন্য আন্তর্জাতিক কোনো চাপ বা প্রস্তাব নেই বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে এবার কোনো আপস করা হবে না। তিনি বলেন, আজকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন কেয়ারটেকার সরকার ডেড ইস্যু। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলে তাদের জেতার কোনো সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ দশটি আসনও পাবে না। এ দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। সেই নির্বাচন আমরা করব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এ ব্যাপারে কোনো আপস হবে না।
সরকারকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করা হবে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। ২০১৪ সালে ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আগের রাতেই সিল মেরে নিয়ে গেছে, আহা কী মজা। এইবার ঘুঘুকে সেই কাজ করতে দেওয়া হবে না। এবার জনগণ জেগে উঠেছে।’
সংলাপ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের একেক সময় একেক বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘জয় আমাদের সুনিশ্চিত। দেখেন তাদের কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে। আবোলতাবোল বলা শুরু করেছে। সকালে বলে এক কথা বিকালে আবার অন্য কথা। কেউ বলে সংলাপ করবে, কেউ বলে সংলাপ করবে না। আরে তোমাদের সঙ্গে সংলাপ করবে কে। তোমাদের সংলাপ তো জানি। তোমরা মিথ্যা কথা বলো আর জনগণের সঙ্গে ছলনা করো। তাই এবার আর কোনো ফাঁদে পা দেওয়া নয়। এবার লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে হবে।’
তিনি বলেন, আমরা যাদের সঙ্গে সংগ্রাম করছি, তারা কিন্তু সাধারণ কেউ নয়, তারা দানব। সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। তারা আমাদের স্বপ্নগুলো ভেঙে দিয়েছে। এখান থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা জনগণকে সংগঠিত করে একটা উত্তাল তরঙ্গের মতো আন্দোলন সৃষ্টি করব। সেই আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা তাদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করব। একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন করে একটি সত্যিকারের পার্লামেন্ট গঠন করব।
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের বলেছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তন হলেই কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। কী পদ্ধতি হয় সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
জাপা চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার হবে বলে আমরা জানি না। আমাদের শাসন পদ্ধতিতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। মন্ত্রীসভায় কে থাকলো না থাকলো অথবা সংসদে কতজন সদস্য আছে বা নেই তাতে কিছু এসে যায় না। প্রধানমন্ত্রীকে তার জায়গায় রেখে কোনো পরিবর্তনকে আমরা পরিবর্তন মনে করি না।
নির্বাচনে কোনো দলেরই সব আসনে যোগ্য প্রার্থী দেওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনে কোনো দলেরই সব আসনে যোগ্য প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে হয়। প্রধান দুই দলের নেতৃত্বে শেষ পর্যন্ত দুটি জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।
জাপা চেয়ারম্যান বলেন, এক পর্যায়ে সব দল নিজস্বতা হারিয়ে দুটি দলে বিলীন হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ৩০০ আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছি। দলকে শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি। তবে নির্বাচনের সময় নির্বাচনের বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।
এদিকে সংবিধান অনুযায়ী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করবে ইসি। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। সে হিসেবে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে ভোট হবে। নির্বাচন কমিশন বলছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ বা ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে । সে হিসেবে তফসিল ঘোষণা হবে নভেম্বরে ।
এমএফ