নিরাপত্তা ভেদ করে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে একবছরে ৩৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ

চট্টগ্রামে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্বর্ণ চোরাচালানের স্বর্গদুয়ারে পরিণত হয়েছে।  আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ফ্লাইটে বাংলাদেশে নানা কায়দায় একের পর এক ঢুকছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণের চালান।

বিমানের সিট ও টয়লেটে, লাগেজে, চার্জার লাইটে, জুতায়, কুকিং মেশিনে, যাত্রীর কোমরে, পায়ুপথে, বেল্টের ভেতরে, স্যান্ডো গেঞ্জিতে,  প্যান্টে ও আন্ডারওয়্যারে অভিনব পন্থায় স্বর্ণের বার এদেশে পাচার করা হয়।  একের পর এক চালান ধরা পড়ার কারণে স্বর্ণ পাচারকারীরা নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কর্মরত কেবিন ক্রু, বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মেকানিক, কাস্টমস, সিভিল এভিয়েশন ও ইমিগ্রেশন পুলিশের কতিপয় সদস্যের সহায়তায় চোরাকারবারিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই রুটে অবৈধভাবে স্বর্ণ আনছে।  চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কিছু কিছু চালান বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার তল্লাশিতে ধরা পড়লেও স্বর্ণের পাচার থেমে নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, যে পরিমাণ স্বর্ণের চালান চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে আটক হয়, তারচেয়ে বেশি পরিমাণ স্বর্ণ নির্বিঘ্নে পাচার হয়ে যায়।

বিমানবন্দর কাস্টমসের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অধিকাংশ স্বর্ণের চালানই নিরাপদে বেরিয়ে যায়।  যে কারণে এদেশে একের পর এক চালান পাচারের চেষ্টা করছে পাচারকারীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আমানত বিমানবন্দরের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এই রুট দিয়ে পাচারকারীরা একের পর এক স্বর্ণের চালান নিয়ে আসছে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের তল্লাশি ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে।  বিমানবন্দরে যাত্রীদের তল্লাশি করা হয়ে থাকে আর্চওয়ে গেট দিয়ে।  কিন্তু সব যাত্রীকে এই গেট দিয়ে স্ক্যানিং করার সুযোগ নেই।  কেবল সন্দেহভাজন যাত্রীদের আর্চওয়ে গেট দিয়ে তল্লাশি করা হয়ে থাকে।  আর আর্চওয়ে গেট দিয়ে স্ক্যানিং করার সময় যাত্রীদের শরীরে অভিনব পন্থায় লুকিয়ে রাখা স্বর্ণের চালান পুরোপুরি শনাক্ত করা যায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দর কাস্টমস গোয়েন্দার একজন কর্মকর্তা দেশ বর্তমানকে বলেন, কেবল সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের স্বর্ণের চালান আটক হয়ে থাকে।  পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা হলে তাদের কেউ একজন বিমানবন্দরে নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে স্বর্ণের চালানের তথ্য ফাঁস করে দেয়।  সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন যাত্রীকে আর্চওয়ে গেট দিয়ে তল্লাশি করা হলে ধরা পড়ে যায়।  কিন্তু যেসব পাচারকারীর ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় না, তারা নিরাপত্তার ফাঁক গলে স্বর্ণের চালান নিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে যায়।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিমান থেকে যখন একসঙ্গে শত শত যাত্রী বের হয়, তখন একজন একজন করে স্ক্যানিং করতে গেলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।  একজন যাত্রীকে আর্চওয়ে গেট দিয়ে তল্লাশি করতে অন্তত পাঁচ মিনিট সময় লাগে।  যাত্রীরা তখন হয়রানির অভিযোগ তুলবে।

সব যাত্রীকে স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে না পারার বিষয়টা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন কাস্টমসের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।  তারা বলছেন, বিমানবন্দরে আরও উন্নত প্রযুক্তির আর্চওয়ে গেট স্থাপন করতে হবে।  উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব যাত্রীকে স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে হবে।  অন্যথায় বিমানবন্দর রুট দিয়ে স্বর্ণ পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক উইং কমান্ডার তাসলিম আহমেদ দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘পাচারকারীরা এখন অভিনব পন্থায় শরীরের মধ্যে স্বর্ণ পাচার করে নিয়ে আসে।  এসব পাচারকারীদের আর্চওয়ে গেট দিয়ে স্ক্যানিং করলেও স্বর্ণের চালান পুরোপুরি শনাক্ত করা যায় না। বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক কিছু সিস্টেম রয়েছে, যাতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।  আমরা সীমাবদ্ধতা থাকা পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।’

গত এক বছরে ৩৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ:

কাস্টমস গোয়েন্দা ও শুল্ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ৩৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।  এসব স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ২৯ কোটি টাকা।  এ সময় স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত বেশ কয়েকজন যাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।  তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়।

সর্বশেষ গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় শাহ আমানত বিমানবন্দরে শারজাহ থেকে এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইটে করে আসা আতিক উল্লাহ নামের এক যাত্রীর কাছ থেকে ২৪টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।  উদ্ধার করা স্বর্ণের ওজন ২ কেজি ৭৯৬ গ্রাম, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার টাকা।  চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা আতিককে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন লাউঞ্জ থেকে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের সদস্যরা আটক করে।

এর আগে গত ২৩ মার্চ সকালে শাহ আমানত বিমানবন্দরে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে করে আসা জিয়া উদ্দিন নামের এক যাত্রীর কাছ থেকে ৩২টি স্বর্ণের বার জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও শুল্ক অধিদপ্তরের সদস্যরা।  উদ্ধার করা এসব স্বর্ণের ওজন ছিল তিন কেজি ৮২৭ গ্রাম, যার আনুমানিক বাজার দাম তিন কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা।  হাটহাজারির বাসিন্দা জিয়া উদ্দিনের পাায়ুপথে এক্স-রে করিয়ে শরীর থেকে এসব স্বর্ণের বার বের করা হয়েছিল।

গত ২৪ জানুয়ারি সকালে দুবাই থেকে ফ্লাই দুবাই এয়ারলাইন্সে করে আসা জিয়াউল হক নামের এক যাত্রীর কাছ থেকে ১ কেজি ৪২৯ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের গোলক পিÐ এবং ২৩৩ গ্রাম ওজনের দুটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে কাস্টমস গোয়েন্দারা।  পাচারকারী জিয়াউল করি এসব স্বর্ণ গলিয়ে গেঞ্জি ও অন্তর্বাসের মধ্যে প্রলেপ দিয়ে তা পরিধান করে এসেছিলেন।  উদ্ধার করা এসব স্বর্ণের বাজারমূল্য ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর শারজাহ থেকে এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইটে করে আসা জসিম উদ্দিন নামের এক যাত্রীর কাছ থেকে দুই কেজি ওজনের স্বর্ণপিন্ড ও দুটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।  এসব স্বর্ণের বাজার দাম ১ কোটি ৬৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।  রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা জসিম এসব  স্বর্ণকে কয়েলে রুপান্তর করে কৌশলে কুকিং মেশিনের ভেতরে স্থাপন করেছিলো।

বিমানবন্দরে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় যেসব মামলা হয়, তার তদন্তে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানো পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  এতে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে পাচারে জড়িত দেশিবিদেশি চক্র।  শুধু বাহককে আসামি করে মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।  ফলে স্বর্ণের পাচার বেড়েই চলছে।

বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণের চালান যায় কোথায়?

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে প্রায়ই স্বর্ণের চালান উদ্ধার হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, চোরাকারবারিরা কেন এই বিমানবন্দরকে স্বর্ণ চালানের নতুন রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে?

চট্টগ্রামের হাজারী গলির এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না  করার শর্তে বলেন, চট্টগ্রামে অনেক জুয়েলারি দোকানেই চোরাচালানের স্বর্ণ বিক্রি হয়।  এখানে স্বর্ণের চাহিদাও বেশি।  এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারেরও সুযোগ রয়েছে।’

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক-ফোঁকর গলে বেরিয়ে যাওয়া স্বর্ণের চালানগুলো সীমান্ত হয়ে দেশের বাইরে পাচার হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও শুল্ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দর কাস্টমস গোয়েন্দার একজন কর্মকর্তা দেশ বর্তমানকে বলেন, বিদেশ থেকে যেসব স্বর্ণের চালান আসে, সেগুলো আমাদের দেশে ব্যবহার হয় না।  এসব স্বর্ণের চালান সীমান্ত হয়ে হয়ে ভারতে চলে যায়।

মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে:

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দারা মাঝেমধ্যে চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করছেন।  বাহকদের তুলে দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে।  মামলা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু চোরাচালানের মূলহোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।  চক্রের মূল হোতারা ধরা না পড়ায় স্বর্ণের পাচারের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এর পেছনের কারণ হিসেবে পুলিশ এবং শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন আন্তর্জাতিক চক্রের কথা।

পতেঙ্গা থানার স্বর্ণ চোরাচালান মামলার একজন তদন্ত কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণ চোরাচালানের মূল হোতারা ভারত ও দুবাইতে থাকে।  তবে দুবাই থেকে স্বর্ণের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে।  বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে তারা স্বর্ণের বার পাচার করছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।  ভারতে স্বর্ণ আমদানিতে শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় চোরাচালানে আগ্রহ বেড়েছে তাদের।  এক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা ব্যবহার হচ্ছে ক্যারিয়ার হিসেবে।  বিদেশে অবস্থানকারী মূল হোতা, দেশে অবস্থান করা প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্বর্ণ ব্যবসায়ী, বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব চোরাচালানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকে।