তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ‘মানি, মানি না’ অবস্থানে থাকলেও উভয়ে কথা বলছে। এই কথা বলাবলি অব্যহত থাকলে পরস্পর আরো কাছাকাছি আসতে পারে। তারপরে হয়ত উভয়ে কিছু কিছু ছাড় দিয়ে একটা সমাধানেও পৌছানো সম্ভব হবে। বুধবার দুই দলের দুই শীর্ষ নেতার বক্তব্যে এমনটা মনে হয়েছে।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি মনে করে, ‘আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরে সংলাপ’। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাধায়ক সরকারের বিষয়টি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তাবিত আলোচনা ও মতবিনিময়ে বিএনপির পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে দলীয় প্রধানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বিএনপি মহাসচিব। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের কথা জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন মির্জা ফখরুল। সিইসির প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও আলোচনায় চিঠি পাঠানোর জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিএনপি।
গত ২৩ মার্চ বিএনপি মহাসচিবকে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে গেল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছিলেন, তারা বিএনপিকে সংলাপের জন্য নয়, অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার জন্য চিঠি দিয়েছেন।
সিইসির এই চিঠির বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল কর্তৃক মহাসচিবকে প্রেরিত পত্রটির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পত্রে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিক না হলেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
চিঠির প্রেক্ষিতে বিএনপির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সভা মনে করে, বর্তমানের মূল রাজনৈতিক সংকট নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কোনো আলোচনা অথবা সংলাপ ফলপ্রসূ হবে না এবং তা হবে অর্থহীন। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নয় এবং ইচ্ছা থাকলেও নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যেহেতু মূল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত আলোচনা ও মতবিনিময়ে সম্ভব নয়, সে কারণে বিএনপি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছে না।
এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংবিধানের বাইরে তত্ত তত্ত্বাধায়ক সরকারে ফেরা সম্ভব নয়। বিএনপি যতই তত্ত্বাধায়ক সরকারের দিবাস্বপ্ন দেখুক না কেন, তা কখনো পূরণ হবে না।
নির্বাচন প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তত্ত্বাধায়ক সরকারে আর ফিরতে পারব না আমরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সবাই চায়, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। অবশ্যই সংবিধান মেনে নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’
বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না, জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তারা (বিএনপি) নির্বাচনে আসুক বা না আসুক, তা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কারণ, সংবিধান মেনেই নির্বাচন করা হবে। তত্ত্বাধায়ক সরকারব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে বিএনপি। এখন আর তার প্রয়োজন নেই।
জনগণ বিএনপিকে পছন্দ করে না বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, যদি আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকত, তাহলে গণ-অভ্যুত্থান না হলেও গণ-আন্দোলন হতো। কিন্তু যা হচ্ছে, তা তাদের নেতা-কর্মীদের আন্দোলন।
মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাউদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে সভায় সভাপতিত্ব করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে জনজীবন সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। অথচ সরকারের মন্ত্রী এবং শাসক দলের নেতাদের ‘জিনিসপত্রের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে এবং এত মানুষ লাইন দিয়ে ইফতার সামগ্রী কিনছেন প্রমাণ করে যে, তাদের আয় বেড়েছে’ উক্তি জনগণের সঙ্গে মশকরা ছাড়া আর কিছু নয়।
এজন্য সরকারকে দায়ী করে মির্জা ফখরুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বারবার সরকারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান করলেও সরকার এ ব্যাপারে উদাসীন। সরকারি দলের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই দ্রব্যম‚ল্য কমানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি ইতিমধ্যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আগামী ১ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে গৃহীত মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানান তিনি।
সভায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিমানের ই-মেইল সার্ভার হ্যাকারদের কবলে পড়ার সংবাদে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এছাড়া গত ২২ মার্চ সরকারের ভূমি দপ্তরের কর্মচারী সুলতানা জেসমিনকে র্যাব কর্তৃক তুলে নেওয়া এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।