চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে আন্তর্জাাতিক বাণিজ্য মেলার ৩০তম আসর। মেলার নাম আন্তর্জাতিক হলেও চোখে পড়েনি বিদেশি কোম্পানির তেমন কোন স্টল। ‘ফরেন প্যাভিলিয়ন’ নামে বাইরের দেশে থেকে আগত ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে বাঙালি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও ইরান ব্যবসায়ীরা পন্য নিয়ে আসলেও, থাইল্যান্ডের পণ্য বা ব্যবসায়ী তেমন চোখে পড়ছেনা। অথচ মেলার প্রচার পত্রে উল্লেখ আছে এসকল দেশের নাম।
সপ্তাহ পার হলেও কিছু কিছু স্টলের নির্মাণ কাজ এখনও চলছে। তবে মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। বলা যায় জমে উঠেছে চট্টগ্রামের বাণিজ্য মেলা।
রোববার মেলায় সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে এমন চিত্র। এ সময় মেলার বিভিন্ন বিষয়ে জানতে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সাড়া দেয় নি কেউ। মেলা অফিসে উপস্থিত কেউ দায়িত্ব নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতেও রাজি হয়নি।
পাকিস্তান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, এবার বেচা-বিক্রি তেমন না হলেও চট্টগ্রামের এই মেলায় তারা প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে অংশগ্রহণ করছে। পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও কাশ্মির থেকে হাতের তৈরি কাপড়, নাগরা ও স্যান্ডেল নিয়ে এসেছেন তারা। এসময় ওয়াসিম আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, তাদের দোকানে মেয়েদের জন্য পাকিস্তানের নাম করা ব্রান্ডের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়াও আছে লাকনো, মোটা পাত্তি, ত্রি পিস-টু পিস সহ হরেক রকম পোশাক। যেগুলো দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। আবদুর রহিম নামে এক জুতা ব্যবসায়ী বলেন, পাকিস্তানের তৈরী নাগরা, স্যান্ডেল ও সু বিক্রি করছেন তারা। এক হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এসকল জুতা। তারা আরো বলেন, প্রতি বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় তারা অংশগ্রহণ করে আসছে।
মেলায় ভারত থেকে আগত ব্যবসায়িদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ভারতের কাশ্মির, কেরালা, মুম্বাই ও দিল্লি থেকে নিজস্ব পণ্য নিয়ে মেলায় এসেছেন। প্রায় পাঁচ দশ বছর ধরে তারা এই মেলায় অংশগ্রহণ করছেন। তারা ভারতের তৈরি কাপড় ও অর্নামেন্ট বিক্রি করছেন মেলায়। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলেন, মেলায় ব্যবসা তেমন হচ্ছে না, সামনে বিক্রি হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন তারা। এ সময় কাশ্মিরি শাল হাউজের মালিক বলেন, ভারতের তৈরি মেয়েদের ত্রি পিচ, ল্যাহেঙ্গা, শাল বিক্রি করছে তারা। পনেরো’শ থেকে পনেরো হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এ সকল কাপড় ও শাল। সুদূর কেরালা থেকে আসা এক ব্যবসায়ি বলেন, এখানে তারা খুব সাড়া পাচ্ছেন। ভারতের তৈরী গোল্ড প্লেট ও বিভিন্ন অর্নামেন্ট বিক্রি করছেন তারা। এ সকল গহনা এক হাজার থেকে দশ হাজারেও বিক্রি করা হচ্ছে।
এসময় দেখা যায়, দিল্লি এ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরী লি: আলাদা প্যাভিলিয়ন নিয়ে বসেছে মেলায়। তাদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে গৃহস্থালী ও রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় সকল কিছু। ক্রেতাদের সুবিধার্থে তাদের স্টলে চলছে বেশ কিছু অফারও। মেলায় ইরানী স্টলের ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় তারা এবারও চট্টগ্রামের মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। এবার ক্রেতাদের জন্য তারা নিয়ে এসেছেন মেয়েদের জুয়েলারি, রূপা ও এন্টিক গহনা। যা নারী ক্রেতাদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও আছে ইরানী বোরকা, প্লাস্টিকের সামগ্রীসহ হরেক রকম পণ্য। এসকল পণ্য পাঁচশ-একহাজার থেকে পাঁচ-দশ হাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ফরেন প্যাভিলিয়ন এবং ফরেন জোনে পাওয়া যাচ্ছে এসকল পন্য।
মেলায় একমাত্র থ্যাইল্যান্ডের পণ্য বিক্রেতা আহসানের সাথে কথা বলে জানা যায, ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা ভাল না থাকায় ছোট একটি স্টল দিয়েছে ফরেন জোনে। মেয়েদের চুলের ক্লিপ, ব্যান্ড, হ্যান্ড ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে এই স্টলে। যদিও মেলায় আগত বিদেশী স্টলের কেউ কেউ জানান, ২০১৫ সালের পর থেকে থাইল্যান্ডের স্টল মেলায় অংশগ্রহণ করেনি।
এসময় মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বাণিজ্য মেলায় বেশির ভাগই ছিল দেশীয় কোম্পানি। মেলায় ঢুকতে মার্কস প্যাভিলিয়ন নজর কাড়ছে সবার। তাদের স্টলে চলছে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বেশ কিছু অফার। যা বাজার মূল্যের চেয়ে কিছুটা কম। সরাসরি কোম্পানি থেকে বিক্রি হচ্ছে বিধায় ক্রেতাদের এ ধরনের ডিস্কাউন্ট বা সুবিধা দিতে পারছে বলে জানান বিক্রয় কর্মিরা। বাণিজ্য মেলার কেওয়াই স্টিল এর স্টলটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। যদিও সম্পূর্ণ কাজ এখনও শেষ হয়নি স্টলটির। সাধ্যের মধ্যে শখের বাড়ি তৈরিতে মানুষকে উৎসাহ দিচ্ছেন তারা। ওয়ালটন, সেভয়, ব্যাঙ্গল, আরএফএল, টেস্টি ট্রিট, ওয়াকার, জেভিসিও, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড সহ অনেক প্রতিষ্ঠান নানা সাজে সাজিয়ে দৃষ্টিনন্দন স্টল। এছাড়াও দেশীয় নানা আচার নিয়ে বেশ কিছু বড় স্টল রয়েছে মেলায়। যা ছিল মহিলাদের কাছে বেশ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
এবারের বাণিজ্য মেলায় আকর্ষণীয় পণ্যের তালিকায় উঠে এসেছে কোটি টাকার খাট। যেটি দশ টাকা টিকেট কেটে দর্শণার্থীদের দেখতে হচ্ছে। এবিষয়ে তারা বলেন, এটি খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা থেকে আনা হয়েছে। যেটি তৈরি করতে সময় লেগেছে তিন বছর দুই মাস। এর ডিজাইন করেছেন আবু বক্কর সিদ্দিকী। এই খাটে মোট ষোলটি পরী, চারটি চাঁদ, ছয়টি সূর্য ও চারটি প্রজাপতিসহ রাজকীয় কারুকাজ করা হয়েছে। এটি তৈরী করতে পঁচাশি ঘনফুট পিউর সেগুন কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। এই খাটের মালিক নুরনবী পেশায় একজন পল্লী ডাক্তার বলে জানা গেছে।
এসময় তারা আরো বলেন, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এটির মূল্য উঠেছে প্রায় ৫১ লাখ। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১৫ লাখ দাম করেছে দর্শণার্থীরা।
এসময় মেলা আরো ঘুরে দেখা গেছে, বিল্ডিং আইটেম, প্লাস্টিক সামগ্রী, আর্টিফিসিয়াল ফ্লাওয়ার, কার্পেট, হাউজহোল্ড আইটেম, পাটজাত পণ্য, বাচ্চা খেলনা ও পুতুল, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, সিরামিকস, প্রসাধনীসহ পাওয়া যাচ্ছে গৃহস্থালী ও নিত্য প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। আয়োজকরা জানান, মেলা প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।