চট্টগ্রামে সিডিএ রয়েল প্লাজা হকার্স মার্কেটের দোকান মালিকদের উন্নয়নের জন্য নিয়ে গড়া সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেটে ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় লিমিটেডে কর্তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে নয়ছয়ের অভিযোগ। ডেভেলপারের কাছ থেকে পাওয়া দোকান লটারির মাধ্যমে না দিয়ে টাকার বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়া, সমিতির অফিস থেকে সদস্যদের মূল্যবান কাগজপত্র সরানোর চেষ্টাসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন সমিতির বেশীরভাগ সদস্যদের নিয়ে একটি পক্ষ। এরই মধ্যে হিসাব চাওয়া নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান দুই পক্ষ। হয়েছে পাল্টাপাল্টি মামলাও। এদিকে নিয়ম মেনে সমিতির কার্যক্রম চলছে বলে জানান দায়িত্বে থাকা হামেদ হাছান।
অভিযোগসহ নানা সূত্রে জানা যায়, সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় লিমিটেড ২০৪ জন সদস্য নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও ১৯৭৪ সালে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন (চট্ট-৫৬১৮/১/২)পায়। নিবন্ধনের পর থেকে এডহক কমিটি ও নির্বাচিত কমিটি এটির পরিচালনা করে আসছে। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে সদস্যদের ভোটে শাহ আলম ও তার প্যানেল নির্বাচিত হয়। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করলে এর পর থেকে আর কোন নির্বাচন হয়নি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে থেকে নতুন কমিটি পরিচালনা কথা থাকলেও অধ্যবধি তার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে হামেদ হাছান পদ ধরে রেখে চালাচ্ছেন কার্যক্রম। এতে সদস্যদের একটি অংশ অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছেন তার বিরুদ্ধে। এমনকি হিসাব নিকাশ দেখতে গিয়ে হামলার শিকারসহ প্রাণনাশের অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। যদিও ওই মামলার ১৫ মিনিট আগে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই ঘটনায় একই ধারায় আরেকটি মামলা হয়। দুই পক্ষই আসামিদের জামিনে যেতে আপত্তি নেই মর্মে দরখাস্ত দিয়ে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন নেন। জামিনে এসে অফিস থেকে মূল্যবান কাগজপত্র সরানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ হামেদ হাছান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোতোয়ালী থানা পুলিশের কাছে উপস্থিত হয়ে বাদি সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় লিমিটেডের সদস্য মোহাম্মদ মারুফ ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা হামেদ হাছানকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে হামলাসহ প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করার অভিযোগে একটি মামলা করেন।
এর ১৫ মিনিট আগে একই ঘটনায় একই থানায় হামেদ হাছান বাদি হয়ে মো. শাহাদাত হোসেন ও মোহাম্মদ মারুফসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে একই আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় উভয়পক্ষ আসামিদের জামিনে যাইতে আপত্তি নাই মর্মে দরখাস্ত দিয়ে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন নেন। গত রবিবার আদালত থেকে জামিনে এসে একই রাতে কাউকে না জানিয়ে সমিতির ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বে থাকা হামেদ হাছান সমিতির অফিস থেকে মূল্যবান কাগজপত্র সরানোর চেষ্টার অভিযোগ তোলেন মোহাম্মদ মারুফ, মো. শাহজাহান, দিদার, জালাল, সাহেদ, নজরুলসহ সমিতির সদস্যরা।
তারা দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমরা সদস্যরা দীর্ঘদিন থেকে অনিয়মে ভরা সমিতির বর্তমানে দায়িত্বে থাকা এবং দাবিদার থেকে হিসাব নিকাশ চাইলে গত ১২ সেপ্টেম্বর হিসাব দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে গিয়ে বহিরাগত লোকজন এনে আমাদের ওপর হামলা করে। হামেদ হাছান এবং তার অনুসারীরা আমাদেরকে প্রাণ নাশের হুমকিও দেন। আমরা ওই দিন আহত হয়ে থানায় গেলে পুলিশের পরামর্শে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাই। অথচ তাদের কেউ আহত হয়নি, আমাদের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগে পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে ১৫ মিনিট আগে তারা আমাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা ঠুকে দেন। এখন সমঝোতার কথা বলে আপোষে জামিনে এসে আবারও অবৈধভাবে সমিতি ও অফিস দখলের পাঁয়তারা করছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ১৯৭৪ সালে ‘সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় লিমিটেড’ নামে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন পাওয়ার পর প্রথমে সমবায় প্রদত্ত প্রশাসক দ্বারা, পরে ১৯৯১ সালে সদস্যেদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনে একটি নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। নির্বাহী পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৯ জন। যেখানে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, প্রতি তিন বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যেমে নির্বাচিতরা এটার দায়িত্ব পালন করবে। প্রথম নির্বাচিত সমিতির নির্বাহী সদস্যরা ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে এবং ২০০৭ সালে পুনরায় নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে। তখন দুটো পক্ষে বিভক্ত হয়ে নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওই সময়ে তৎকালীন সমিতির দায়িত্বরতরা সাইফুল নামের এক সদস্যকে সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করলে বাধে বিপত্তি। সদস্য পদ রক্ষায় মামলা করলে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে নতুন আরেকটি এডহক কমিটি গঠন করে। যার আহ্বায়ক ছিলেন ওয়াহিদুল আলম আর সদস্য ছিলেন নূর মোহাম্মদ ও হাজী নজির। পরবর্তীতে হাজি শাহ আলম তৎকালীন নির্বাচন আবারও হাইকোর্টের মাধ্যমে স্থগিত করেন।
পরবর্তীতে সাইফুলের সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার মামলায় হাইকোর্ট আদেশ দেন ২০১৮ সালে। নতুন এডহক কমিটিতে আহ্বায়ক হয়েছিলেন জেলা সমবায় অধিদপ্তরের মুরাদ আহমদ নামে এক কর্মকর্তা।
পরবর্তী পর্যায়ে শাহ আলম এবং প্যানেল বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, হাইকোর্টের মাধ্যেমে এই প্রশাসকের দায়িত্ব স্থগিতের আদেশ নেন। এদিকে দায়িত্বে থাকা শাহ আলম ২০২০ সালে মারা যায়। এর পর থেকে অধ্যবধি ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্বে আছেন হামেদ হাছান।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় এবং এক পক্ষের স্বৈরাচারী নিয়মনীতি চালু থাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমিতির অন্যপক্ষের সাধারণ সদস্যরা। দীর্ঘদিন সমিতির কোন হিসাব-নিকাশ থেকে সমিতির সাধারণ সদস্যরা বঞ্চিত এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আসে। সমিতির বড় কোন বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে বা চুুক্তিপত্র করার ক্ষেত্রে সাধারণ সভা করার নিয়ম থাকলেও তা না করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও আছে। যা গত ২০১২ সালের ২৮ মে মার্কেট ডেভেলপারের নামে (৭১৬৯) চুক্তিপত্র সম্পাদন করে। সাধারণ সভা ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে চুক্তিপত্র করে। এছাড়াও সর্বশেষ মার্কেটে দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করে। যেখানে লটারির মাধ্যমে দোকান মালিকদের দোকান বরাদ্ধ দেওয়ার কথা ছিল সেখানে অবৈধভাবে টাকার বিনিময়ে দোকান বরাদ্ধ দেন তিনি।
চলতি বছরের ৯ সেপ্টেস্বর সাধারণ সদস্যদের সমিতির হিসাব নিকাশ দেখাবেন বলে ৩ দিন সময় নেন। পরে ১২ সেপ্টেম্বর হিসাব না দিয়ে বহিরাগত লোক দিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেন। তারা হামেদ হাছানকে প্রশ্ন রেখে বলেন, ২০/২১ সালে অডিট রিপোর্ট সাক্ষর আছে অর্থ সম্পাদক হিসাবে তাহলে কিভাবে তিনি ২০২০ সালে থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে আছেন। এসব নানা অনিয়মের কারণ তুলে ধরলে তিনি (হামেদ হাছান) এবং তার অনুসারীরা ওপর চড়াও হয়ে মারমুখী হয় বলেও দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বর্তমান ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বে থাকা হামেদ হাছান দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এটা আমাদের সদস্যদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি ছাড়া আর কিছু নয়। সমিতি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় চলছে এবং নিয়ম অনুযায়ী সব কার্যক্রম চলছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংঘর্ষের সময় তার পক্ষের একজন চোখে মারত্মক আঘাত পেয়েছে। প্রতিপক্ষের বহিরাগত লোকদের এনে হামলায় জড়ান তারা।
নতুন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করলে আদালতে মামলা চলমান আছে বলে উল্লেখ করে বলেন, নিস্পত্তি হলে নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন হবে। এছাড়া সদস্যরা যদি কোন বিষয়ে ভুল বুঝে কিংবা কোন বিষয়ে অভিযোগ করে তখন বসে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করবেন বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে থানা সমবায় অফিসার মোহাম্মদ ওছমান গনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানান, হামেদ হাছান সভাপতি নয় এডহক কমিটির সদস্য হিসাবে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে কাজ করছেন। এর বাইরে বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান তাই এ বিষয়ে এর বাইরে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
উভয়পক্ষের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক সুকান্ত চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, মামলার উভয় পক্ষের আসামিরা জামিনে আছেন। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে মানতে নারাজ। যেখানে বর্তমান দায়িত্ব থাকাদের কোনভাবে মানতে রাজি নয় প্রতিপক্ষ, আবার একটি পক্ষ তাদেরকেই চায়। আমরা ফৌজদারী মামলার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। সিভিল মামলাটি ঊনারা চালিয়ে নিস্পত্তি করবেন। যাতে এ বিষয়ে কোন পক্ষ সংর্ঘষে না জড়ায় এবং অপ্রীতিকর কোন ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।
উল্লেখ্য, সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় লিমিটেড এর পরিচালনায় হাইকোর্ট, চট্টগ্রাম জজ আদালত, ১ম সহকারী জজ আদালত, ১ম যুগ্ম জেলাজজ আদালত ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন আদালতে সমিতির নির্বাচন বিষয়ক, মার্কেট নিমার্ণ সংক্রান্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেসহ নানা বিষয়ে ১৯ মামলা চলমান রয়েছে। যেখানে সর্বশেষ অডিটে(২১-২২) মামলা খরচ দেখানো হয় ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এর আগেও এই মামলাগুলো পরিচালনায় লাখ লাখ টাকা খরচ করা হয়।