পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি আজ গাজীপুরের দিকে। বহুল আলোচিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচন আজ। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি ঘরানার একজনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী প্রকিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করলেও ঋণ খেলাপির কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তার মা জায়েদা খাতুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তিনিই আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী হিসেবে জনগনের মধ্যে বেশ উত্তাপ ছড়িয়েছে। এছাড়া বিএনপির ভোট বর্জনের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলটির কর্মী সরকার শাহনূর ইসলাম (রনি সরকার)।
পাঁচ রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি ভোটের মাঠে আছেন আরও তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তাদের সঙ্গে ৫৭টি ওয়ার্ডে ২৪৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থী এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৭৯ নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খানের সাথে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা- স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের। তবে, ঋণখেলাপি হওয়ার দায়ে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ায় সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমই এবারের নির্বাচনে মূল ‘মাথাব্যাথা’।
আরো চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগামী একমাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবার তারিখ রয়েছে। কিন্তু সেই নির্বাচনগুলোতে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কোন প্রার্থীর খবর আপাতত পাওয়া যায়নি । ধারনা করা হচ্ছে সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালে বিএনপির কোন প্রার্থী থাকছে না। দলটি সিটি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা আগেই দিয়েছে। যে কারণে দলীয় অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী থাকলেও তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করার সাহস দেখাচ্ছেন না। একইভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সাহস দেখাবে বলে মনে হচ্ছে না।গাজীপুরে এক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দলীয় যে শাস্তি প্রদান করা হলো তাই সারাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাদের জন্য মেসেজ হয়ে গেছে।
নির্বাচনের প্রচারনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনকে বাধা দেয়ার অভিযোগ এসেছে বার বার। তিনি নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগও করেছেন। আজ ভোটের দিন কি পরিস্থিতি দাঁড়ায়, কি হতে পারে এ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও রয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের দিকে আজ দেশবাসির দৃষ্টি থাকবে সারাদিন। শেষ হাসি কে হাসবেন এখানে তাই এখন দেখার বিষয়।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ইভিএমের মাধ্যমে চলবে ভোটগ্রহণ । রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় স‚ত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে ৪৮০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য ৪৮০ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৩ হাজার ৪৯৭ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, ৬ হাজার ৯৯৪ জন পোলিং অফিসারসহ মোট ১০ হাজার ৯৭১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৩৩৩টি প্রতিষ্ঠানে ৪৮০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হবে।
নির্বাচনে মোট ৪৮০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৫১টি গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ )এবং ১২৯টি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম জনান, অতি গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়াও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিসি ক্যামেরায় সব কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হবে: ইসি রাশেদা
গাজীপুরের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবগুলো কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, এর মাধ্যমে ঢাকা থেকে কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। ভোটের আগের দিন গাজীপুরে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের আলাদা কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। ছোট-বড় সব ইলেকশনই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানেই নির্বাচন হচ্ছে আমরা তা মনিটরিং করছি। ইলেকশন মানে ইলেকশন। গাজীপুর সিটি নির্বাচনও মনিটরিং করা হবে। অলরেডি কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়ে গেছে। মনিটরিংয়ে আমরা যদি কোনো অনিয়ম পাই, তাহলে সেটা আমরা অবশ্যই আমলে নেব। এটার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করবো না।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে: জিএমপি কমিশনার
গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেছেন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাধ্যমে যেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারি, সেটা নিশ্চিত করব। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল ফোর্স, স্ট্রাইকিং ফোর্স, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। এটা একটা সমন্বিত প্রয়াস। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব।’
বুধবার (২৪ মে ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্রিফিং অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন। কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বুধবার পর্যন্ত সুন্দরভাবে চলে আসছি। আগামীকাল নির্বাচনের দিন আপানারা যাতে সুন্দরভাবে দেশবাসীকে খবর জানাতে পারেন সে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করব। সিটি নির্বাচনে ৪৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫১টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ৩৫১টি কেন্দ্রে আমরা আলাদাভাবে গুরুত্ব দেব।’
নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে জিএমপি কমিশনার বলেন, ‘প্রিজাইডিং অফিসারের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা আছে। যে কোনো বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসার যোগাযোগ করে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। ভোট কেন্দ্র সঠিকভাবে আছে কিনা, নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি আছে কিনা, কোথায় নিরাপত্তার ঝুঁকি, এসব বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আমাদের পারস্পারিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা যাতে নির্বাচনটা সঠিকভাবে করতে পারি।’
কেন্দ্রে প্রার্থীর এজেন্টদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে: রিটার্নিং কর্মকর্তা
আইনের মধ্যে থেকে নির্বাচন কেন্দ্রে সব প্রার্থীর এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহানগরীর শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে নির্বাচনের নিরাপত্তা বিষয়ক ব্রিফিং শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ভোটকেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার বিষয়ে প্রার্থীদের আশঙ্কা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফরিদুল ইসলাম বলেন, আপনারা যে রকম আশঙ্কা করছেন, সবগুলো বিষয় আমাদের নজরে আছে। এগুলো মাথায় রেখে আমরা সব পরিস্থিতি বিবেচনা করছি এবং সেভাবেই কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা আমাদের নজরে এলে তাৎক্ষণিক আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবস্থা নেবে। সবার যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা আমরা তাদের জন্য সেগুলো নিশ্চিত করব।
কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল
নৌকায় ভোট না দিলে ভোটকেন্দ্রে আসতে হবে না- এমন কথা বলার পর এখন নিজেরই ভোট করা হচ্ছে না আজিজুর রহমানের। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। কথার মাধ্যমে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করায় তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেছে। গাজীপুরে ভোটগ্রহণের ঠিক আগের দিন বুধবার নির্বাচন কমিশন আজিজুরের প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায়। অভিযোগ পাওয়ার পর এদিন আজিজুরকে ডেকেছিল ইসি। তার বক্তব্য শোনাসহ এই সংক্রান্ত শুনানি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং তা স্বীকার করার প্রেক্ষিতে লাঠিম প্রতীকে কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করেছে (ইসি)। আজিজুর রহমান সোমবার (২২ মে) সন্ধ্যা ৭টায় পুবাইল এলাকার কলের বাজার নামক স্থানে মিছিল ও জনসভা করেন। ‘নৌকা ছাড়া কাউকে ভোট কেন্দ্রে আসতে দেওয়া হবে না’- তার এমন বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ায় আসে। তা দেখে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার ভিত্তিতে ইসি আজিজুরকে ঢাকায় তলব করে।