দখল-দূষণে কাঁদছে নগরের এক প্রাচীন জলাধার
বলুয়ার দিঘির আর্তনাদ: সরেজমিন প্রতিবেদন-১
কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম শহরের গোড়াপত্তন। এক সময় চট্টগ্রাম ছিলো অসংখ্য পুকুর-দিঘিতে পরিপূর্ণ একটি শহর (এখন বলা হয় মহানগর)। পার্বত্য শহরের সমতল ভূমিতে ছিলো ছাড়া ছাড়া জনবসতি, তারই মাঝে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো জলাশয়। অবশ্য চট্টগ্রাম কখনো মরু শহর ছিলো না। জলাশয়ের আধিক্যের কারণ সেকালের রাজা-বাদশাহ এবং ভূম্যাধিকারীরা পাল্লা দিয়ে বড় বড় দিঘি খনন করাতেন। যেমন চকবাজারের উপকণ্ঠে কমলদহ দিঘি (বর্তমানে বিলুপ্ত) খনন করিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মোগল শাসক একজন নবাব। দিঘির উত্তর পাশে কাতালগঞ্জ (নবাব প্রাসাদ) গিলে খেয়েছে খোদ সরকারি একটি সংস্থা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) আশির দশকে কাতালগঞ্জে গড়ে তুলেছিলো আবাসিক এলাকাটি। এটি চউকের প্রথম আবাসিক এলাকা। চট্টগ্রাম মহানগরের এ রকম একটি ঐতিহাসিক দিঘির নাম পুরনো মানুষগুলো ভুলতে বসেছেন। অনেক ঐতিহাসিক দিঘির নামে এখনও রয়ে গেছে এলাকার ‘নাম’ কিন্তু দিঘি নেই। দিঘির পেটে বস্তি, বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। আন্দরকিল্লা রাজা পুকুর লেইনে পুকুর নেই, বহুতল ভবন গিলে খেয়েছে পুকুর। দেওয়ানজী পুকুরের নামে পরিচিত দেওয়ানজী পুকুর বাই লেইন। একসময় এখানে পুকুরকেন্দ্রিক রাতঅবধি চলতো সাংস্কৃতিক আড্ডা। দেওয়ানজী পুকুর বাইলেইন এখনো আছে কিন্তু নিশ্চিহ্ন ‘দেওয়ানজী পুকুর’। সভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং ভূমিদস্যুদের লোভ-লালসার শিকার হয়ে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে পুকুর-দিঘি। সংকুচিত হয়ে আসছে অনেক পুকুর-দিঘির আকার।
চট্টগ্রাম শহরের এমনি আরেকটি ঐতিহাসিক দিঘির নাম ‘বলুয়ার দিঘি’। দ্বিশত বছরের পুরনো দিঘি। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জনৈক হিন্দু জমিদার বলু পোদ্দারের নামে এই দিঘির নামকরণ। তিনি ছিলেন দিঘির একক মালিক, তবে সেটা সি এস খতিয়ানমুলে। পরবর্তীতে আর এস এবং বি এস খতিয়ানমুলে হাত বদল হয়ে দিঘির মালিকানা গেছে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তির হাতে। দখলে-দুষণে কাঁদছে বলুয়ার দিঘি। এই বোবা কান্না শুনছে না কেউ। এটি চট্টগ্রামের কোরবানীগঞ্জ জামে মসজিদের মুসল্লিদের ওজুর উৎস, স্থানীয় বাসিন্দা, খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ, চাক্তাই, টেরিবাজার, ঘাটফরহাদবেগ এলাকার অনেক অধিবাসী এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারির গোসল এবং ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নির্বাপনের পানির উৎস বলুয়ার দিঘি। কিভাবে এই ঐতিহাসিক দিঘি সংকুচিত হয়ে আসছে, এর জন্য কারা দায়ী এবং সিডিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা কি-তা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়। আজ প্রথম পর্বে থাকছে মুসল্লিদের একসময়কার ওজু এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পারিবারিক নিত্য ব্যবহার্য্য দিঘির পানি কিভাবে ক্রমেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বলুয়ারদিঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় অবস্থিত কোরবানীগঞ্জ জামে মসজিদ। স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, প্রতি শুক্রবার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জুমার নামাজ আদায় করে এই মসজিদে। এছাড়া প্রতি ওয়াক্তে প্রায় পাঁচশত মুসল্লি নামাজ আদায় করে থাকেন। মসজিদটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন দিঘির পানিতে ওজু করার সুবিধার্থে বিশাল একটি ঘাট নির্মাণ করা হয়। ঘাটে একসঙ্গে ৫০ জনের বেশি মুসল্লি ওজু করতে পারতেন। পুকুর ঘাট এখনও আছে, তবে সেটা আর ব্যবহার হয় না।
স্থানীয় মুসল্লিদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ওজুখানার চেয়ে দিঘিঘাটে স্বাচ্ছন্দ্যে ওজু করা গেলেও মুসল্লিরা এখন আর ঘাটে নামে না। দুষিত হয়ে পড়েছে দিঘির পানি। যার কারণে মসজিদের ওজুঘাটে পা মাড়ায় না মুসল্লিরা। পুকুরের পূর্ব পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সেমিপাকা ও টিনসেডের ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে ভাঙ্গাারী এবং পলিথিনের দোকান। পশ্চিমপাড়ে বেশিরভাগ বিপি সিট, জিপি সিট ও স্টিল আলমিরার দোকান। দোকানের ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে দিঘিতে। দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের কোণায় সততলা ভবন এবং পশ্চিম-উত্তর পাড়ের কোণায় গড়ে ওঠা সামিন আনিস হাইটস নামের আটতলা ভবনের বাসিন্দারা, পশ্চিমপাড়ে জরাজীর্ণ দোতলা ভবন শাহ আবদুল ছমদ আমানত ওয়াকফ এস্টেটের ভাড়াটিয়ারা বিভিন্ন আবর্জনা ফেলছে বলে স্থানীয়রা এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন। যার কারণে একদিকে দিঘির গভীরতা কমছে এবং সংকুচিত হয়ে পড়েছে দিঘি। পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনার কারণে পানি দুষিত হয়ে পড়ায় স্বচ্ছ নেই ঐতিহাসিক এই দিঘির পানি। দিঘির পানিতে ওজুর কোনো পরিবেশ নেই। দূষিত পানি থেকে এক ধরণের দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। পানিবাহিত নানা রোগ-ব্যাধিতেও ভুগছেন অনেকে।
দিঘির অদূরেই রয়েছে অভয়মিত্র শ্মশান। শ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করে আশেপাশের বাসিন্দা এবং দূর-দূরান্তের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলুয়ার দিঘির পানিতে গোসল সেরে পবিত্র হয়ে বাসায় ফিরে যেতেন। কিন্তু এসব শুধু স্মৃতি। তবে বাসায় পানি সংকটের কারণে কোরবানীগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, টেরিবাজার, ঘাটফরহাদবেগ এলাকার কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের দিঘির পূর্বঘাটে দূষিত পানিতে গোসল করতে হচ্ছে বলে এই প্রতিবেদকে জানান। কোরবানীগঞ্জ মসজিদের অদুরে একটি কলেজ, দুটি উচ্চ বিদ্যালয় ও দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এক সময় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড গরমে দিঘিঘাটে গিয়ে মুখে জল ঢাললেও এখন আর যায় না। চাক্তাই খালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ, টেরিবাজার, ঘাটফরহাদবেগ ও আন্দরকিল্লা এলাকার পানির উৎস বলুয়ার দিঘি। বড় ধরণের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বলুয়ার দিঘি থেকে পানি নিয়ে অগ্নি নির্বাপন করা হয়। কিন্তু যেভাবে দিঘির গভীরতা কমছে এবং সংকুচিত হয়ে আসছে তাতে এসব এলাকার পানির উৎস-বলুয়ার দিঘি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। তখন ঢাকার বঙ্গবাজারের মত বড় ধরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বড় ধরণের ক্ষয়-ক্ষতির আশংকা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা আমান উল্লাহ এই প্রতিবেদককে বলেন, এক সময় দিঘিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। প্রতি বছর দিঘিতে বড় জাল ফেলে মাছ ধরা হতো। এখন পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠায় মাছের সংখ্যাও কমে গেছে। গত দুই বছরে দিঘিতে জাল দেওয়া হয়নি। দিঘির ওয়ারিশরা মাছের চাষ করতেন এবং প্রতিবছর জাল ফেলে মাছ ধরে নিকাটাত্মীয়দের মধ্যে বিতরণ করতেন। রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি এবং দস্যুপনার কবলে পড়ে মাছ চাষ দুরে থাক, পুকুর রক্ষা করা যাবে কিনা -সেটি নিয়ে আমরা সন্দিহান। তিনি আরো জানান, বেশ কয়েকদিন আগে পুকুরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু আবার ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। গতকাল শনিবার সরেজমিন পরিদর্শনেও দিঘিতে প্রচুর পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা ভাসতে দেখা গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মাহনগরের উপপরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস দেশ বর্তমানকে বলেন, পুকুরের পনির স্যাম্পল নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা না হলেও পুকুর দখলের অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। বলুয়ার দিঘি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্ত করে বলুয়ার দিঘি ভরাটে জড়িতদের ব্যাপারে আমরা একবার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম। আইন লংঘন করে কেউ পুকুর-দিঘি দখল ও দুষণ করলেও অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এমএফ