তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে ভুমিকম্প: নিহতের সংখ্যা ৪,৩০০ ছাড়িয়েছে
২২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার
তুরস্ক-সিরিয়া সিমান্তে শক্তিশালী ভুমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩০০ জনে। গোটা বিশ্ব যখান যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট ও গভীর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত তখন আরও একটি মানবিক বিপর্যয় দেখছে।
সোমবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় ৪টা ১৭ মিনিটে এ ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যখন দেশটির প্রায় সব মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ৪০ সেকেন্ড ধরে চলা এ ভূমিকম্পের কম্পন পৌঁছায় লেবানন ও সাইপ্রাসেও। ভয়াবহ ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে গেছে তুরস্কের অন্তত ১০টি শহর। মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ বলছে, তুরস্ক, সিরিয়া, সাইপ্রাস ও লেবানন, ইসরায়েল ও মিশরেও অনুভূত হয় ভূমিকম্প। ৭ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পনসহ শত শত আফটারশক তুরস্কে আঘাত হানে। এই ধাক্কার ধারাবাহিকতা ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। এখনও ধ্বংসস্তূপে আটকা বহু মানুষ। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখনও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া লোকজনকে উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯২১ জন। আহত হয়েছেন আরও ১৫ হাজার ৮৩৪ জন। এ নিয়ে সিরিয়া ও তুরস্কের মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৪ হাজার ৩০০ জনে।
২২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার:

ভূমিকম্প আঘাত হানার ২২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সানলিউরফা প্রদেশের ওই নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘর নেই, খাবার নেই, বেঁচে থাকার কিছুই নেই:
শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে তুরস্ক। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ পরিবারের কেউ না কেউ হতাহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে গেছেন তারাও আতঙ্কে দিন পার করেছেন। নিজ চোখে দেখেছেন প্রিয়জনের রক্তাক্ত মরদেহ। দিনের আলো নিভতেই ‘মৃত্যুপুরী’তে নেমেছে রাজ্যের ভয়-শঙ্কা। ক্ষুধার্ত-ঘরহারা মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছেন তারা। অসহায় মানুষেরা বলছেন, ‘বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বনই তাদের আর নেই।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা আনা ফস্টার সোমবার দিনগত রাতে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের শহর ওসমানিয়ে ও কাহরামানমারাস রাস্তায় ঘুরে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেছেন।
তিনি বলেন, প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীর গরম রাখতে অনেকে রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবস্থান করছেন। সেখানে থাকা একজন নারী আমাকে জানালেন, ভূমিকম্পে তিনি ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এখন তার থাকার জন্য একটি বিছানাও অবশিষ্ট নেই। পাশেই দাঁড়ানো মধ্যবয়সী আরেক নারী বলে ওঠেন- ‘ভোরে ঘটনার পর থেকে আমরা কিছুই খাইনি। আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। আমাদের ঘর নেই, খাবার নেই, পানি নেই, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কিছুই নেই।’
এদিকে, ভূমিকম্পে হতাহতদের স্মরণে সাতদিনে জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। স্থানীয় সময় সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে এক টুইটবার্তায় তিনি এ ঘোষণা দেন।
টুইটবার্তায় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান লেখেন, ‘সাতদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এসময়ে আমাদের জাতীয় পাতাকা অর্ধনমিতভাবে উত্তোলন করা হবে। আগামী রোববার (১২ ফেব্রুয়ারি) সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ শোক পালন করা হবে। দেশে ও বিদেশে তুরস্কের বিভিন্ন অফিসে হতাহতদের প্রতি শোক জানিয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতভাবে উত্তোলনের আহ্বান জানাচ্ছি।’
১৯৯৯ সালের পর এটাই তুরস্কে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ওই বছরের আগস্টে সাত দশমিক ছয় মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প তুরস্কের দক্ষিণে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল মারমারায় আঘাত হানে। ১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পে দেশটিতে সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ নিহত হয়।