তীব্র তাপদাহ : চট্টগ্রামে বাড়ছে ‘হিট স্ট্রোকে’ মৃত্যু!
* গত ১০দিনে শিশু ও শিক্ষার্থীসহ ৯ জনের মৃত্যু * অসহনীয় গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ
সারা দেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও বৈশাখী গরমের তীব্রতায় হাঁসফাঁস করছে প্রাণীকূল। তীব্র তাপপ্রবাহের কারনে অতীষ্ঠ জনজীবনে নানা রকম শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি যোগ হচ্ছে হিট স্ট্রোকের মতো ঘটনার। গরমের তীব্রতার এই সময়ে নানা অসুস্থতা নিয়ে চট্টগ্রামে সরকারী-বেসরকারী সব হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর চাপ। হাসপাতালে ফাঁকা যাচ্ছে না শিশু সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কোনো বেড। চট্টগ্রামে গত ১০ দিনে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ ৯ জনের মৃত্যু ‘হিট স্ট্রোকে’ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বেশ কয়েকজন স্কুল শিক্ষার্থী। তবে চট্টগ্রামে হিট স্ট্রোকে এখনও কোনো মৃত্যু হয়নি বলে দাবি চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরীর। তাঁর দাবি অন্যকোন রোগ বা কারনে হতে এসব মৃত্যু হতে পারে। এদিকে মোবাইল অ্যাপে তাপমাত্রা গত ১ সাপ্তাহে ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি দেখালেও তাপমাত্রা অনুভূতি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত।
সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল (রবিবার) সকালে কালুরঘাট ফেরিতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মাওলানা মো. মোস্তাক আহমেদ কুতুবী আলকাদেরী (৫৫) নামে এক মাদরাসা শিক্ষক। ওই দিন কালুরঘাটের পশ্চিম পাড় থেকে পায়ে হেঁটে ফেরিতে ওঠার পরেই এ ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি হিট স্ট্রোক করেছেন। তিনি কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া লেমশীখালীর মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে। দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক তিনি। বোয়ালখালী উপজেলার খিতাপচর আজিজিয়া মাবুদিয়া আলিম মাদ্রাসায় কর্মরত থাকলেও বসবাস করতেন নগরীর চান্দগাঁও এলাকায়। একইদিন সকালে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নে প্রচণ্ড গরমে মাথা ঘুরে পড়ে জাহাঙ্গীর আলম (৫৩) নামে এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি হিট স্ট্রোকে মারা গেছেন। তিনি মঘাদিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাফরাবাদ গ্রামের কামাল চেয়ারম্যান বাড়ির দেলোয়ার হোসেনের পুত্র।
এর একদিন আগে (২৬ এপ্রিল) পটিয়ায় হিট স্ট্রোকে মোজাম্মেল হক (৭৫) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড মাঝের ঘাটার বাসিন্দা।
গত ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের আনোয়ারায় উপজেলায় রোশমিয়া জেবিন (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রীর হিট স্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা যায়। ওই শিক্ষার্থী হিট স্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। সে বটতলী এলাকার মনির আহমদ চেয়ারম্যান বাড়ির ফরিদ আহমেদের মেয়ে।
এর দুইদিন আগে গত ২২ এপ্রিল কর্নেলহাট শ্যামলী বাস কাউন্টারের সামনে হিটস্ট্রোকে শুকুর আলী নামের এক যুবক টেম্পোর মধ্যে মারা যায়। সে লক্ষীপুর জেলার দালাল বাজারের হাজীবাড়ির মৃত মানিক মিস্ত্রির ছেলে। তিনি সীতাকুণ্ডে জলিলের সিডিএ এলাকার বুলু মেম্বারের ভাড়া ঘরে থাকতেন।
গত ২১ এপ্রিল পটিয়া উপজেলার হাঈদগাঁও ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইব্রাহিম তালুকদারের বড় ছেলে জয়নুল আবেদীন দিদার (৫৮) হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন । ওইদিন একই ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সামশুল আলম (৭০) হিটস্ট্রোকে মারা যান। তিনি ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য।
গত ১৯ এপ্রিল বোয়ালখালী উপজেলায় সাফা নামের ছয় মাস বয়সী এক কন্যা শিশুর মৃত্যু ঘটে। সে শিশুটি পশ্চিম শাকপুরা ২নম্বর ওয়ার্ড আনজিরমারটেক সৈয়দ আলমের নতুন বাড়ির মো. নিজাম উদ্দীনের মেয়ে। চিকিৎসকরা ধারণা করছেন সে হিটস্ট্রোকে মারা গেছে। একই দিন হিটস্ট্রোকে শাহজাদা ছালেহ আহমদ শাহ (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া এলাকার হজরত আহমদ হাসানের ছেলে।
অন্যদিকে তীব্র তাপদাহে এখন পর্যন্ত ৪ শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতরবিবার (২৮ এপ্রিল) সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের শেখেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অসুস্থ শিক্ষার্থীরা হল-ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুঁই দাশ ও মরিয়ম আক্তার নিপা এবং ৮ম শ্রেণির মাইসা আক্তার। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা আলম সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। এর আগে ২৫ এপ্রিল নগরীর খুলশীর ওয়ারলেস এলাকার গার্ডেন ভিউ ন্যাশনাল একাডেমী নামের একটি স্কুলের আল হাছিন নামে দশ বছর বয়সী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। জানাযায় স্কুলে জুতা মোজা না পারায় শাস্তি দেন স্কুলের শ্রেণিশিক্ষক। পরে জুতা পরতে বাসায় ফেরত পাঠান ওই শিক্ষক। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথেই জ্ঞান হারায় শিশুটি। এইদিকে তীব্র গরমে স্কুল কলেজে চলছে শ্রেণী কার্যক্রম। সহনীয় মাত্রায় না কমলে স্কুল বন্ধ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন অভিভাবকদের এক অংশ।
সিভিল সার্জন ডা.মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী গতকাল সোমবার দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে হিট স্ট্রোকে কারো মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে নেই। বিভিন্ন মৃত্যুর উদাহরণ দিলে দিনি বলেন, এসব মৃত্যু বিভিন্ন রোগ কিংবা অন্য কারনে হতে পারে। ডাক্তার ছাড়া কেউ হিট স্ট্রোকে মৃত্যু নিশ্চিত করতে পারে না। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, তীব্র তাপদাহের এই সময়ে শিশু ও বয়স্কদের কোনোভাবেই ঘরের বাইরে বের হতে দেওয়া ঠিক হবে না। তাপপ্রবাহের এই সময়ে বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ঘরের মধ্যে অবস্থান করতে পারলে ভালো। একইসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পানিসহ তরল খাবার খেতে হবে। শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথাও বললেন তিনি।