নিজ জেলা চট্টগ্রামেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল। তার এই অবসরের সিদ্ধান্তে গোটা ক্রীড়াঙ্গনেই চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। দুপুর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ী শুভেচ্ছা ও আবেগঘন বার্তা জানাতে ব্যস্ত ছিলেন ক্রিকেটাররা। সাবেক থেকে বর্তমান সকলেই তার ক্রিকেটীয় অবদান নিয়ে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
কিংবদন্তির বিদায়: মাশরাফি
সাবেক টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা‘কিংবদন্তির বিদায়’ উল্লেখ করে তামিমের উদ্দেশে প্রশ্নও ছুড়েন এভাবে-তামিম, তোর সিদ্ধান্ত অবশ্যই একান্তই তোর। এটা কারও ভালো লাগলেও তোর, ভালো না লাগলেও তোর। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই হবে। তবে সবচেয়ে ভালো কোনটা, সেটা তুই ছাড়া কেউই ভালো বুঝবে না। তাই তোর এই সিদ্ধান্তকে আমি ব্যক্তিগতভাবে শতভাগ সম্মান জানাই।
তবে কিছু কথা জানতে মন চায়, মাত্র ৩৪ বছর ১০৮ দিনেই বিদায় কেন! আসলেই কি চালিয়ে যেতে পারছিস না? না কি কোনও চাপ তোকে বাধ্য করেছে! তোর অনেক ভক্ত হয়তো খুঁজে ফিরবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর। আজ খুঁজবে, এমনকি ভবিষ্যতও আরও অনেকদিন খুঁজবে।
মাশরাফি আরো লিখেছেন, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলাম, তখন তুই ছিলি আমার অন্যতম ‘স্নাইপার।’
তুই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে যা কিছু দিয়েছিস, তা আমরা আজীবন মনে রাখব।
আর একটা কথা, দলের ভেতর নানা পরিসংখ্যান নিয়ে বিশ্লেষণ নির্ভর আলোচনা এখন কে করবে, ঠিক জানি না। হয়তো কেউ করবে। তবে তুই এই জায়গায় সবসময়ই থাকবি সেরাদের সেরা। গুড বাই মি. তামিম ইকবাল খান। একজন কিংবদন্তির বিদায়।
জাতীয় দলের সাবেক পেসার এবং বর্তমান বোলিং কোচ নাজমুল হোসেন বলছেন এটা আবেগী সিদ্ধান্ত, ‘তামিমের এমন সিদ্ধান্তে আমি নিজেও আসলে ইমোশনাল হয়ে গেছি। ২০০৭ সালে সে যখন বিশ্বকাপ খেলে এর আগে থেকেই কিন্তু তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই সময় থেকেই তাকে খুব ভালো করে চিনি। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা আবেগী সিদ্ধান্ত। যদিও এটা তার একান্তই ব্যক্তিগত।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমপক্ষে বিশ্বকাপটা খেলে যদি সে অবসর নিত তাহলে আমার কাছে মনে হয় আরো ভালোবাসা-সম্মান পেত। গত দুয়েকদিনে যেটা হয়েছে, তাতে হয়তো তামিম মানসিকভাবে অন্য কিছু নিয়ে প্রস্তুত ছিল না। সেসব চিন্তা করেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত তার। তামিমকে আরও কিছুদিন পেলে হয়তো ভালো হতো, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য। ব্যক্তিগতভাবে আমি তামিমকে মিস করব। তামিম অনেক বুদ্ধিমান ছেলে, সে সবকিছু বুঝেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেহেতু বিশ্বকাপের আগে তামিমের যে রেকর্ড সেটি বাংলাদেশ মিস করবে। ’
এদিকে সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ জানালেন তামিমের এমন সিদ্ধান্তে অবাক হওয়ার কথা। তবে কেন তার এমন সিদ্ধান্ত সেটা নিশ্চিত নন তিনি, ‘তামিম আমাদের দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার। গেল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সে দেশসেরা ব্যাটারদের একজন। তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। তবে বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেললে দেশের জন্যই ভালোই হতো। ’
বাংলাদেশ দলের প্রথম সুপারস্টার ও সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। লন্ডন থেকে এই ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘আমি শকড। আর হয়তো ৬-৭টা ম্যাচ পরেই বিশ্বকাপ। তার আগেই এমন সিদ্ধান্ত। জীবনটাই এরকম, তাকেও হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের সব ফরম্যাটে তিনি টপ স্কোরার ছিলেন এবং ২৫টা সেঞ্চুরি অবশ্যই বিরাট অ্যাচিভমেন্ট। আমার মনে হয় না সে ফিরে আসবে, যেহেতু বিশ্বকাপের আগেও আর তেমন সময় নেই। ’
তামিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে আশরাফুল আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য পথটা কঠিন হয়ে গেল। যখন আমরা তৃতীয় ওপেনার খুঁজছিলাম, তার ভেতরই অভিজ্ঞ একজনকে হারালাম। তামিম তোমাকে ধন্যবাদ, গত ১৯টা বছর তুমি আমাদেরকে অনেক ইন্টারটেইন করেছ।
তামিমের সিদ্ধান্তে এখনও ঘোরের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের নির্বাচক আব্দুর রাজ্জাক রাজ। তিনি বলছেন, ‘একটু আগে শুনলাম, দেখি এখন কি হয় না হয়; আমি আসলে এখনও কিছু বুঝতেছি না। সত্যি বলতে আমি এখনও ঘোরের মধ্যে আছি। এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না, এটা ক্রিকেট বোর্ডের ব্যাপার। তামিমের কথা তো তামিম বলে গেছে। ’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলামও চট্টগ্রামেরই সন্তান। মামুনুলের দৃষ্টিতে তামিমের এই ঘোষণা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা, ‘সামনে বিশ্বকাপ। ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভালো একটি সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা রয়েছে। এর আগে অধিনায়কের অবসরের ঘোষণা দেশের ক্রিকেটের বড় ধাক্কা। ’ তবে ক্রিকেটের জন্য ধাক্কা হলেও তামিম পরিকল্পনামাফিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করেন ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
জাতীয় ফুটবল দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক জাহিদ হাসান এমিলি তামিমের সিদ্ধান্তে কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন, ‘বাংলাদেশ-আফগানিস্তান সিরিজ চলমান। যেখানে সে অধিনায়কত্ব করছে। চলমান সিরিজের মাঝে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়াটা খুবই বিস্ময়কর। ’
সাম্প্রতিক সময়ে তামিমের ফর্ম, ফিটনেস ও কোচের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। সব কিছু সমন্বয় করেই তামিমের অবসরের ঘোষণা আসার মতো ছিল বলে মত এমিলির, ‘এই সিরিজ শেষে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে আরও সুন্দর সমাপ্তি হতে পারত। তামিমের মতো ক্রিকেটারের মাঠ থেকেই বিদায় নেওয়া উচিত।’
দেশের সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব তামিমের আকস্মিক সিদ্ধান্তে খানিকটা দ্বিধান্বিত, ‘তামিম অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন কিন্তু কেন দিলেন সেটা স্পষ্ট করে বলেননি। নিশ্চয়ই এর পেছনে লুকায়িত কোনো কারণ রয়েছে। ’
দেশীয় হকির সুপারস্টার রাসেল মাহমুদ জিমি তামিমের অবসরকে ক্রিকেটের বড় শূন্যতা হিসেবে দেখছেন, ‘আরও একজন ভালো মানের ক্রিকেটার আমরা হারালাম। তার মতো ওপেনার বাংলাদেশে আর সহসাই আসবে না। ’
যা বলছে বিসিবি
হঠাৎ করে তামিমের অবসর ঘোষণার সিদ্ধান্তে ভক্ত-সমর্থকদের পাশাপাশি অবাক হয়েছেন বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুসও। বোর্ড পরিচালক বলেন, ‘তামিমের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা একদমই অপ্রত্যাশিত, যেটা অনাকাঙ্খিত। খুবই দুঃখজনক। আমরা এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ’
জালালের মতে, তামিম ইচ্ছে করলে আরও ২ বছর অনায়াসে জাতীয় দলে খেলতে পারতেন। বোর্ড থেকে তামিমকে সিদ্ধান্ত বদলের জন্য কোনো অনুরোধ জানানো হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জালাল বলেন, ‘আমরা বোর্ড থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাব। ’
তামিমের শেষ অনুরোধ
নিজের আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন। দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা। নিজের অবসরের ঘোষণা দিয়ে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক। কথা বলছিলেন আর কাঁদছিলেন। প্রিয় বাবাকে মনে করে কষ্ট আরও বাড়ছিল তার। তবুও নিজেকে সামলে চোখ মুছে এগিয়ে যান।
১৬ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনের ‘একটা অনুরোধ আপনাদের প্রতি। যারা সামনে ক্রিকেট খেলবে আপনারা তাদের কথা ভালো লিখবেন, খারাপ লিখবেন। যা-ই লিখবেন, ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। সীমানা অতিক্রম করার দরকার নেই। ক্রিকেটের বাইরেও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্রিকেটেই স্থির থাকেন। যদি ক্রিকেটার ভালো খেলে তাহলে ভালো লিখেন। যদি খারাপ খেলে তাহলে সমালোচনা করুন। আমি নিশ্চিত আপনারাও জানেন যে, অনেক সময় আপনারা সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা করেন। এজন্য অনুরোধ করছি, যারা ক্রিকেট খেলছে…সামনে বিশ্বকাপ আছে। আশা করছি আপনারা দলের পাশে থাকবেন একজন সদস্যের মতো। অনুরোধ করবো, দলকে সমর্থন করার জন্য। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ’
তামিমের অবসরে দলে রনি
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল খান। চট্টলার এই খানের অনুপস্থিতিতে চলমান আফগানিস্তান সিরিজে নতুন করে আগামী দুই ওয়ানডের জন্য দলে জায়গা পেয়েছেন রনি তালকুদার। এছাড়া সহ-অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা লিটন দাসকে দেখা যেতে পারে অধিনায়কের ভূমিকায়!
যদিও স্থায়ী অধিনায়ক হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া হবে তা এখনও অনিশ্চিত। অবশ্য রনির অন্তর্ভুক্তিতে বিসিবির একজন কর্মকর্তা ক্রীড়াভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজকে বলেছেন, ‘তামিম ইকবাল থাকছেন না এটা বিবেচনায় নিয়ে স্কোয়াডে একজন ওপেনার নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে রনি তালুকদার অন্তর্ভুক্ত হবে। ’
এর আগে আয়ারল্যান্ড সিরিজের আগে জাকির হাসান ইনজুরিতে পড়ায় তার বদলি হিসেবে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে দলে ডাক পেয়েছিলেন রনি। এরপর তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে হওয়া আইরিশদের বিপক্ষের সিরিজেও দলে ছিলেন। পরবর্তীতে চলমান আফগানিস্তান সিরিজে কেবল টি-টোয়েন্টি দলে রাখা হয় তাকে।