আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের উপর থেকে বিদেশিদের চাপ যেনো সরে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সহ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগি বড় বড় দেশগুলোর নির্বাচন নিয়ে যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা গেছে, দিন দিন তা যেনো থিতিয়ে আসছে। তারা যেনো আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রিদেশ সফরের মধ্য দিয়েই চাপের পরিবর্তে নমনীয় হচ্ছেন বিদেশি বন্ধুরা। যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের রাষ্টীয় বিবৃতিতে আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের ‘অভ্যন্তরীণ’ বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এখন। মাঠের বিরোধী দল বিএনপির দাবি আগামী নির্বাচন হতে হবে দলনিরপেক্ষ তত্ত¦াবধায়ক সরকারের অধীনেই। দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। যে কারণে আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দলটি অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
রোববার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর সেতুভবনে সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভা শেষে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিদেশি কোনো চাপ নেই । তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যসহ কোন বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্র তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে কোন চাপ দেয়নি। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপও করতে চায়নি।
সেতুমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনে জেতার গ্যারান্টি দেবে এমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় বিএনপি। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০১ ও ২০০৬ সালের মতো পক্ষপাতম‚লক আচরণ করেছিল।
ওবায়দুল কাদের বলেন, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য হারানো পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগ চায় না।
সেতুমন্ত্রী বলেন, আজকের নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। এই কমিশনের অধীনে নির্বাচন করতে বিএনপির সমস্যা কোথায়? নির্বাচন করার জন্য এই নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সর্বাত্মক চেষ্টা তাদের মধ্য আছে।
এদিকে গত শনিবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম তার নির্বাচনী এলাকার দলীয় এক সমাবেশে বলেছেন, ‘যে দল আগামী নির্বাচনে বাধা দিতে চাইবে সে দল অসাংবিধানিক। তারা সংবিধানের কিছুই বোঝে না বলে আমি মনে করি। কারণ নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে, আর সরকার তাতে সহযোগিতা করবে।’
নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে মায়া বলেন, ’বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে, তাহলে নির্বাচন তাদের জন্য বসে থাকবে না। যথাসময়েই নির্বাচন হবে।’
এদিকে স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়মিত ব্রিফিংকালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উপপ্রধান মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় মন্তব্য করে করে বলেছেন, এই নির্বাচন যেন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় এটিই তাদের চাওয়া।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন আসন্ন এবং বিরোধী দল এই নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অভিমত কী- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে প্যাটেল বলেন, ‘যেহেতু এটি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত, আমরা যা চাই তা হলো নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হোক এবং বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হোক।’ তার এ বক্তব্য দপ্তরের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন যেহেতু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় সেহেতু এ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উপপ্রধান মুখপাত্র বলেন, ‘আমি বলব যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ গত বছর ক‚টনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন করেছে এবং আমরা সেই সম্পর্কগুলোকে আরও গভীর করার জন্য উন্মুখ।’
এদিকে গত বুধবার সকালে ঢাকায় দ‚তাবাসে রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি তার দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ উল্লেখ করে এ বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে পছন্দ করবেন বলে জানিয়েছেন।
শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক জাপান সফরের বিষয়ে আলোকপাত করেন রাষ্ট্রদূত কিমিনোরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৫ থেকে ২৮ এপ্রিল জাপান সফর করেছেন। ওই সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতাসহ আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান ব্যাপক সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছে বলে ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সাংবাদিক বাংলাদেশের ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ইওয়ামা কিমিনোরিকে তার পূর্বসূরি ইতো নাওকির করা মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেন।
তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইতো নাওকি বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচনে রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি ওই মন্তব্যকে সমর্থন করেন কিনা?
জবাবে রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বলেন, আমার পূর্বসূরি কী বলেছেন- তা আমার জানা নেই। তবে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকব। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে জাপানের কোনো উদ্বেগ আছে কিনা। জবাবে জাপানি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না’।
চীনের বেল্ট-অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) সই করেছে বাংলাদেশ। এখন ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগের আওতায় জাপানের সঙ্গে সামরিক কৌশলগত সহযোগিতা সাংঘর্ষিক হবে কিনা- জানতে চাইলে জাপানি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক। চীনের উদ্যোগ সম্পর্কে আমার খুব বেশি জানা নেই। তবে আমরা অন্তর্ভুক্তিম‚লক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছি। আমরা আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বাড়াতে চাই। অবাধে চলাচলের সুবিধা চাই’।
জাপানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা শুরু হয়েছে। জাপানি সামরিক জাহাজ বাংলাদেশে এসেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যেও আমাদের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন’।
রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে গঠিত কোয়াডকে সামরিক জোট হিসেবে অভিহিত করতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আছে। তবে এটা কোনো সামরিক জোট নয়’।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে জাপানের ‘অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স’ (ওএসএ) প্রকল্প থেকে সহায়তা পেতে পারে।
প্রসঙ্গত,ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিভিন্ন সময় বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। এমনকি দুই দলের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের অভিপ্রায়ের কথা বলেছেন। মার্কিন দ‚তাবাসের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনকেও যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ‚মিকা কিছুটা নমনীয় বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে গত কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলছিল সেই ধারায় এখন কিছুটা ভাটার টান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাহলে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে নমনীয় হয়েছে?
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে কম কথা বলছেন। এর কারণ একাধিক;
১. বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে, এ নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন কথা বলছেন। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে জো বাইডেন জয় বাংলা বলে যে চিঠি লিখেছেন, সেই চিঠিতেও আগামী নির্বাচনে যেন জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে সে ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু তার অবস্থান সুস্পষ্ট করেছে, এ নিয়ে নতুন করে তাদের কোন বক্তব্য নেই। এ কারণে তারা একই বক্তব্য আবার দিতে চাইছেন না।
২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে আগ্রাসী ভ‚মিকা গ্রহণ করেছিল তার সাথে ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু এর মধ্যে যুক্তরাজ্য তার অবস্থান অনেকটা নমনীয় করেছে। নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে এসেছেন সারাহ কুক। যার আগেও বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে তার অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলেই সারাহ কুককে পাঠানো হয়েছে এমন কথাও কূটনীতিক পাড়ায় শোনা যায়।
৩. বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিপরীতে চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ তৎপরতা শুরু করেছে। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে এবং বুঝে শুনে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে বিভিন্ন মহল মনে করছেন। ভারতকে পাশে না পাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন যেভাবে সরাসরি তদারকি করতে চায় তার সাথে ভারত একমত নয়। ভারত সব সময় একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অটল।
তারা মনে করে যে বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে নির্বাচন হবে সেটি বাংলাদেশের জনগণ, নির্বাচন কমিশন ও সরকার ঠিক করবে। আর এ কারণেই তারা সরাসরিভাবে নির্বাচনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। ভারতকে কাছে না পাওয়ার কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা মৌনব্রত পালন করছে। তবে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলুক কিংবা না বলুক তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।