ঢাকা দখলে মরিয়া জামায়াত

# পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী সারাদেশে জামায়াতের কর্মী ২ কোটি ২৯ লাখ

# যে কোনো মূল্যে মহাসমাবেশ সফল করবো
-ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সেক্রেটারি, ঢাকা দক্ষিণ

# ১০ লাখ কর্মীকে নিয়ে শাপলায় অবস্থান করবো
-অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত আমীর

# সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না
-বিপ্লব কুমার সরকার, যুগ্ম কমিশনার, ডিএমপি

আগামীকাল ২৮ অক্টোবর রাজধানীর শাপলা চত্বরে ডাকা মহাসমাবেশ সফল করার ব্যাপারে মরিয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতের মতো শক্তির মহড়ায় টিকে থাকার নীতিতেই রয়েছে দলটি। ঘোষিত সমাবেশে ১০ লাখ কর্মী সমাগম করার আশা করছেন দলটির নেতারা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আলেমদের মুক্তি এবং দ্রব্যমূল্যের কমানোর দাবিতে শক্তির পরীক্ষা দেবে তারা। একইসঙ্গে সমাবেশের অনুমতি ও সহযোগিতা চেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে আবেদন করে দলটি। কিন্তু পুলিশ তাদের সমাবেশ করতে অনুমতি দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
পুলিশ বলছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সমাবেশের অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। তারা কোনো ভাবে অনুমতি ভাবে না। দলটি সহিংসতা ঘটতে এই সমাবেশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের এই টার্গেট কোনো দিন পূরণ হবে না। কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ।
দলটির শীর্ষ নেতারা বলছে, এই সরকার আর ক্ষমতায় থাকবে না। কূটনৈতিক প্রেসক্রিপশনে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। সংঘাতপূর্ণ কর্মসূচির মতো কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। গত দেড় বছরের সিরিজ আন্দোলনে তাদের অন্তত ২২ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। প্রায় ৫০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এক লাখ ৪২ হাজার মামলা হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর আলাদা ব্যানারে যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি পালন করে দলটি। ওইদিন রাজধানীর মৌচাকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ বছর আবারও সরকার পতন ও নির্বাচনি কৌশল হিসেবে রাজপথমুখী কর্মসূচিতে শক্তির জানান দিতে চায় দলটি। ওই দিন তারা ঢাকায় ১০ লাখ লোক জমায়েত করার চেষ্টায় রয়েছে। যে কোনো মূল্যে ঢাকায় নেতাকর্মীদের জড়ো করা হবে। এটা নিয়ে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে জামায়াত এবং শিবিরের সব নেতাই ঢাকায় আসছেন। তারা ঢাকা শহরের মতিঝিল, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শাহবাগ, ধানমন্ডি, মগবাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসব এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কারা কর্মসূচিতে বাধা দিতে পারে, তাদের দিকে নজর রাখবে বলে শোনা যাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে কারা বাধা দিতে পারে, সামনের সারিতে এসে সংঘর্ষে জড়াতে পারে, তাদের আগে থেকেই নজরে রাখা হয়েছে দলটির শীর্ষ নেতারা।
দলীয় সূত্র বলছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আর মাত্র কিছু দিন পরই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ এখনও নির্বাচনের কোনো পরিবেশ তৈরি হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করা পূর্বশর্ত হলেও সরকার লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করার কোনো চিন্তাই করছে না। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ গোটা জাতি মনে করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কারণ এর আগে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো দেশে-বিদেশে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু সরকার গণতন্ত্রকামী মানুষের সে দাবি পাস কাটিয়ে যেনতেন প্রকারে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিনা ভোটের সরকার দলীয় বিবেচনায় প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়েছে।
সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে দলটির স্থায়ী সদস্য বা রুকনের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৮৬৩। পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে দলটির স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ৩ গুণ বেড়ে ৭৩ হাজার ৪৬ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে এই দলটির কর্মী সংখ্যা আগের ২ লাখ ২১ হাজার থেকে ৩ গুণ বেড়ে ৬ লাখ ৩৯ হাজার হয়েছে। দলটির নথির তথ্য অনুযায়ী, তাদের নারী রুকনের সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বেড়েছে এবং নারী কর্মী বেড়েছে ৪ গুণ। একইভাবে ২০০৮ সালে দলের সহযোগী সদস্য ১ কোটি ৩ লাখ থাকলেও এখন তা বেড়ে ২ কোটি ২৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। দলটি বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে তাদের নির্দিষ্ট কোনো কার্যালয় নেই। ভাড়া বাসায় তারা তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সারাদেশে ওয়াজ মাহফিলের মতো বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তাদের সভা-সমাবেশ, মতাদর্শ প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে পারব, কেউ বাধা দিলে তাকে প্রতিহর করেই সমাবেশ সফল করবো।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ দিন পর রাজনৈতিক সমাবেশ করার চিন্তা করছি। সমাবেশ ঘিরে নেতাকর্মীরা উজ্জিবিত। আমরা ইতোমধ্যে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক শেষ করেছি। ১০ লাখ নেতাকর্মীরা জড়ো হবে এই সমাবেশে।
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, পাড়া-মহল্লা থেকে দলে দলে ঢাকায় ফিরছে নেতাকর্মীরা। প্রয়োজনে তারা পায়ে হেটে সমাবেশে আসবে। কোনো বাধা তাদের আটকাতে পারবে না।
এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, যে কোনো মূল্যে সমাবেশ সফল করবো। বাধা দিলে প্রতিহত করবো। কোনো বাধায় আটকাতে পারবে না সমাবেশ।
জামায়াতে ইসলামী ভারপ্রাপ্ত আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৬ সালে ওই সময়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে বিএনপির লোক আখ্যা দিয়ে তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না বলে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, যাতে তিনি কেয়ারটেকার সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন। সেজন্য ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পিটিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে দেশে এক ভয়াবহ অরাজকতা তৈরি করেছিল। দলীয় লোক বিবেচনায় বিচারপতি কেএম হাসানের অধীনে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? দেশবাসী মনে করে, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনই সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেছেন, যারা ঢাকা শহরে সভা-সমাবেশ করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তাদের রাস্তায় নয়, রাস্তা বাদ দিয়ে অন্যত্র উন্মুক্ত স্থানে সমাবেশ করার কথা বলা হয়েছে। সেটা খোলা স্থান বা মাঠও হতে পারে। ঢাকা একটা মেগা সিটি। এখানে যদি লাখ লাখ লোকের সমাবেশ হয়, তাহলে দুই আড়াই কোটি নগরবাসীর সমস্যা হয়। যারা অসুস্থ তাদের হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে যেতে সমস্যা হয়। ঢাকা নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য কোনো জায়গা ঠিক করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। অন্য কোথায় সমাবেশ করবেন সেটা তারাই নির্ধারণ করুক।