ডিজিটাল দেশে এনালগ অ্যাক্ট

ডিজিটাল দেশে এনালগ অ্যাক্টের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে সাইবারে নানাভাবে হয়রানি, প্রতারণার শিকার ভূক্তভোগীদের সাপোর্ট সিস্টেম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসেই অন্তত শতাধিক ভূক্তভোগীকে সরাসরি সহায়তা হতে বঞ্চিত হয়েছেন। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যদি এখনি আইনের সংশোধন করা না হয়, তাহলে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়বেই।

সদ্য পাস হওয়া সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের ৫২ এর (খ) ধারায় অপরাধের আমলযোগ্যতা জামিনযোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে। বলা আছে ৫২ এর (খ) ধারায় উপধারা (১) এর ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ ধারাকে অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংগায়িত করা হয়েছে।

আইন মতে, আমলযোগ্য অপরাধ মানে পুলিশ সরাসরি মামলা নিতে পারবে, আসামি ধরতে পারবে, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করতে পারবে এবং আদালতে প্রেরণ করতে পারবে। আর অ-আমলযোগ্য অপরাধের বেলায় বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্ত নতুন আইনে অ-আমলযোগ্য অপরাধগুলোর বেলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পুলিশের নেই। ভূক্তভোগীকে বড়জোর জিডি করা বা আদালতের দরজা দেখিয়ে দিতে পারবে।

এই অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রেও একটি বড় অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের একাধিক কর্মকতা। তারা বলছেন, আইনের প্রথম অধ্যায়ের ২ এর ড) ধারায় বলা আছে, সাইবার ক্রাইমের সব মামলা তদন্ত করবে পুলিশ। আর পুলিশের সংগায় বলা আছে- পুলিশ অফিসার অর্থ ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিম্নে নহেন এরূপ কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে বোঝানো হয়েছে। অথচ বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। থানা পর্যায়ে যেসব পুলিশ ইন্সপেক্টর কাজ করেন তাদের বেশিরভাগ সময় কাটে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মতামত/পরামর্শ দিয়ে এবং সে মতে কাজ করে। ফলে থানায় আসা প্রতিটি আমলযোগ্য কিংবা অ-আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক তদন্ত করেন একজন সাব-ইন্সপেক্টর। সুতরাং এই ধারারও পরিবর্তনটা সময়োপোযোগী করার সুযোগ রয়েছে।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ ধারায় যথাক্রমে কম্পিউটার সোর্স কোড পরিবর্তন সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড (হ্যাকিং), মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কে বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণার দণ্ড, ডিজিটাল বা ইলেক্ট্রনিক জালিয়াতি, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণা, পরিচয় প্রতারনা বা ছদ্মবেশ ধারণ, আক্রমাণত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটনের অপরাধ, ওয়েবসাইটে বা কোন ইলেকট্রনিক বিন্যানে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এইরুপ কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার এবং আইন বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের অপরাধকে অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন যেহেতু বার বার করা সম্ভব নয় এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টটি যেহেতু তৈরি করার সুযোগ হয়েছে তাহলে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তো বটেই, সেই সাথে সময়েরও আগে কি কি ধরণের অপরাধ হতে পারে এবং সেসব অপরাধের মামলা, প্রক্রিয়া, দণ্ড সবই এই আইনের আওতাভূক্ত হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন সাইবার বিষেশজ্ঞরা।

সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলেন, সাইবার ক্রাইমের ফুটপ্রিন্টগুলো খুব দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, ফলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হলে যত দ্রুত সম্ভব ল’ইনফোর্সমেন্ট বাহিনীর কাজে নামা উচিত। কিন্তু বিদ্যমান আইনে সাইবারের সব ধরণের অপরাধকে অ-আমলযোগ্য করার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে আইনের অনেক অসঙ্গতি রয়ে যাবে। এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে দ্রুত আইনটির সংশোধন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাইবার অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিটিটিসি, ডিএমপি)- এর এডিসি নাজমুল ইসলামকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অত্র আইনের ৫২(খ) ধারায় অনেকগুলো ধারাকে অ-আমলযোগ্য করা হয়েছে। অ-আমলযোগ্য হলে পুলিশ সরাসরি কাজ করতে পারে না বা মামলা নিতে পারে না। বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে অনুসন্ধান করতে হয়, যাতে গ্রেফতার বা ডিজিটাল প্রমাণাদি সিজ করা কঠিন হয়ে যায়। এটি সময় সাপেক্ষও বটে। তাই দ্রুত সাইবার ভিক্টিমদের সেবা দেয়া সম্ভবপর হয় না। পাশাপাশি নতুন আইনে ইন্টারনেটে উগ্রবাদ, অনলাইনে জুয়া, ক্রিপটো কারেন্সী এবং ডার্ক ওয়েবে- সংঘঠিত অপরাধকে দমন করার জন্য নতুন ধারা সংযুক্ত করার অনুরোধ করেন তিনি।

সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের এমন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মনে করেন নিদেনপক্ষে সাধারণ ভিকটিম সাপোর্ট এর জন্য ধারা ২২ (সাইবার ফ্রড), ২৩ (সাইবার ফরজারি), ২৪ (সাইবার ছদ্মবেশ), ২৬ (ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য বা বায়োমেট্রিক তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট করার অপরাধ) ২৮ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত যার কারণে বড় বড় দাঙ্গা সংঘটিত হয়) ও ৩০ (অবৈধ ই-লেনদেন যেমন অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি বা যে কোন ফিনটেক জালিয়াতি ইত্যাদি)  ধারা কগনিজেবল(ঈড়হমহরুধনষব) না করলে থানায় মামলা নেয়া ও ভিকটিম সাপোর্ট দেয়া খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। উক্ত ধারাগুলোর কোনটাই সমালোচিত নয়, এই ধারাগুলো সাধারণ সাইবার ভিকটিমের পক্ষে সেবা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও মনে করেন, বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্ত শুরু করলে সময় ক্ষেপনের কারণে ডিজিটাল আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে ও ন্যায়বিচার ব্যহত হবে। অসংখ্য সাধারণ সাইবার ভিক্টিম দ্রুত সেবা না পাওয়ার কারণে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে যা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ধারা ২ (ঢ) সংজ্ঞা পরিবর্তন করে পুলিশ মানে ইন্সপেক্টর বুঝানো হয়েছে যেখানে তদন্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইন্সপেক্টর নাই; অথচ সাইবার অপরাধের দরুন হাজার হাজার মামলা থানায় রুজু হয়, সাব ইন্সপেক্টর দিয়ে তদন্ত না হলে শুধু ইন্সপেক্টর তদন্ত করলে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে অধিক মামলার চাপের কারণে অনেক সময়ের পরও তদন্ত শেষ হবে না ও দেরি হবার কারণে ভিক্টিম সেবা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই পুলিশ ইন্সপেক্টর এর পরিবর্তে সাব-ইন্সপেক্টর সন্নিবেশ করা যুক্তিযুক্ত বলে তারা মনে করেন।

অধিকন্ত:  ৩০ (অবৈধ ই-লেনদেন) ধারায় শাস্তি হিসেবে অর্থদন্ডের কথা বলা হয়েছে। মানে টাকা চুরি করে নিয়ে গেলে শাস্তি শুধু টাকা দিয়েই শোধ, এতে এই অপরাধের প্রবণতা বাড়বে। তাই এই ধারায় শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ডও রাখা উচিত বলে তারা মনে করে।

ডিজিটাল দেশে এনালগ আইনের এমন অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন করলে ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সেীর মহাপরিচালক আবু সাঈদ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান দেশ বর্তমানকে বলেন, এই আইনের খসড়ায় স্টেক হোল্ডারদের মতামত দেয়ার জন্য অনেক আগেই উম্মুক্ত করে দেয়া ছিল। যতগুলো মতামত, পরামর্শ, সংযোজন এবং বিয়োজনের প্রস্তাব এসেছে, নতুন এ আইনে আমরা তার সবগুলোই যুক্ত করেছি। আইন হয়ে গেছে বলে যে এটি আর সংশোধন বা সংযোজন করা যাবে না বিষয়টি এমনও নয়। তবে কোন অংশীজন যদি মনে করে যে, সুনির্দ্রিষ্ট কিছু ধারার পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংযোজন প্রয়োজন তাহলে আমার অনুরোধ থাকবে তারা যেনো লিখিত আবেদন করেন। লিখিত আবেদন পেলে অবশ্যই আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবো।