সর্বশেষ ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো)। প্রতিবেদনে ডেসকোর বাৎসরিক লোকসান দেখানো হয়েছে ৫৪১ কোটি টাকা। মূলত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এ লোকসান হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি।
সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে ডেসকো বিদ্যুৎ বিতরণ বাবদ ২৬৮ কোটি টাকা আয় করেছে, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৫২১ কোটি টাকা। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটি মোট পরিচালন আয় হয়েছে ৪২১ কোটি টাকা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৬৯৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির প্রত্যক্ষ পরিচালন ব্যয় ও অবচয় বেড়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির বৈদেশিক মুদ্রা ওঠানামাজনিত কারণে ৪২৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, আগের হিসাব বছরে যা ছিল মাত্র ৮ কোটি টাকা। ২০২৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটির ৫৪১ কোটি টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে। আগের হিসাব বছরে ৬৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৩ টাকা ৬১ পয়সা। আগের হিসাব বছরে শেয়ারপ্রতি আয় (আপিএস) ছিল ১ টাকা ৫৯ পয়সা। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ডেসকোর পর্ষদ।
২০২১-২২ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল ডেসকোর পর্ষদ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৫৯ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৮৬ পয়সা। ২০২০-২১ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল ডেসকো। আলোচ্য সময়ে ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৮৬ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১ টাকা ১৫ পয়সা। ৩০ জুন ২০১৯-২০ হিসাব বছরেও কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। আগের হিসাব বছরে ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় কোম্পানিটি। তার আগের দুই বছরে ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ পেয়েছিলেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডেসকো লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ২ হাজার ২২১ কোটি ১০ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৩৯ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৪। এর মধ্যে সরকারের হাতে রয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ২৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ, বিদেশী বিনিয়োগকারী দশমিক শূন্য ৪ ও বাকি ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
এত লোকসান কেন, এই প্রশ্নে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমীর আলী বলেন, ‘এই অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বাড়িয়েছিল ২৮ শতাংশ। কিন্তু আমরা খুচরায় আমরা বাড়াতে পেরেছি ১৫ শতাংশ। দামের এই পার্থক্য আমাদেরকে লোকসানে নিয়ে গেছে। ডেসকো এমডি বলেন, বিদেশি সংস্থাগুলো থেকে যেসব ঋণ নেয়া আছে সেগুলো তো ডলারে পরিশোধ করতে হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ঋণ পরিশোধের খরচও বেড়ে গেছে। আমরা টাকায় আয় করি আর ডলারে ঋণ পরিশোধ করি। এখানেও একটা পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। যখন ঋণ নেয়া হয়েছিল তখন ডলারের দাম ছিল ৮২ টাকা। এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে এক ডলার সমান ১০৯ থেকে ১১০ টাকায়। কেবল ডলারের বাড়তি দরের জন্য বাড়তি ৪২৮ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে।
টাকার অবমূল্যায়ন কেবল ডেসকো না, চাপে ফেলেছে সরকারি সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ারগ্রিডকেও। গত মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের নয় মাসে কোম্পানিটি ৩৩২ কোটি ১৩ লাখ টাকারও বেশি লোকসান দিয়েছে একই কারণে। অর্থবছর শেষে এই লোকসানটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই হিসাব এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ডেসকোর মতো তাদেরও লোকসান শুরু হয় গত বছরের অক্টোবর থেকে।
২০০৬ সালে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এর শেয়ারের ৭৫ শতাংশ সরকারের মালিকানায় আছে। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে, ৮.৯৬ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে এবং ০.০৬ শতাংশ আছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।