ঠেকানো যাচ্ছে না মাদক পাচার
প্রায় প্রতিদিনই দেশে ঢুকছে ছোট-বড় চালান, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ
ঠেকানো যাচ্ছে না মাদক পাচার। মাদকের বিস্তার ও আসক্তির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এমন কোনো দিন নেই যে দেশে ঢুকছে না মাদকের ছোট-বড় চালান। গত ৬ মে মধ্যরাতে কক্সবাজারের উকিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে ২৪ কেজি ২০০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ (আইস) জব্ধ করেছে র্যাব। এর আগে ২৬ এপ্রিল উখিয়ার পালংখালী সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ২১ কেজির চালান জব্দ করে বিজিবি। বিভিন্ন হাত ঘুরে অধিকাংশ চালান পৌঁছে যায় রাজধানী ঢাকায়। এরপর পাইকারি ও খুচরো বিক্রেতাদের মাধ্যমে তা মাদকসেবীদের কাছে চলে যায়।
জানা গেছে, মাদকসেবীর মধ্যে অভিজাত পরিবারের সন্তান, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছে। মাদকের নীল ছোবলে তরুণ সমাজ সর্বনাশের পথে পা বাড়ালেও সেটি ঠেকাতে ব্যর্থ বিদ্যমান আইন। আবার এমনও অভিযোগ রয়েছে মাদকের কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও মাদকের মিথ্যা মামলা দিয়ে দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে বহু নিরপরাধ মানুষের জীবনকে। ফলে মাদক বিরোধী আইন কঠোর থেকে কঠোর হলেও নির্মূল হচ্ছে না মাদকের বিস্তার।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সংশ্লিষ্ট একটি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ডিএমপির মাদক বিরোধী অভিযানে ১৬ হাজার ৯২০ জন মাদক সেবনকারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার করা হয় ১০ হাজার ৮০০ জন, ২০২০ সালে ১৪ হাজার ৪০০ জন, ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করা হয় ১৬ হাজার ২০০ জন ব্যক্তিকে। গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে ১৮ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের পাঠানো হয়।
এদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট’র এক তথ্য মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৬ লাখ। মাদকের বিস্তার এবং আসক্তির সংখ্যা এই ক্রম:বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন মাদক আইনের অপপ্রয়োগ এবং আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের দুর্নীতি।
তাদের মতে, মাদক আইন যতটা না মাদক নির্মূলে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে। পকেটে কয়েক পুরিয়া গাঁজা ঢুকিয়ে পথচারির কাছ থেকে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের গাঁজা উদ্ধারের খবর প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়। অথচ কারও কাছে প্রায় গাঁজার চেয়েও ক্ষতিকর সিগারেট, তামাক, জর্দ্দা, গুল পাওয়াকে কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। গাঁজা সেবন, বহন এবং সরবরাহ আইনত: দÐনীয়। যদিও অ্যালকোহল বা মদ খাওয়া আইনত: নিষিদ্ধ নয়।
নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা দিয়ে ফাঁসানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে আইনে ‘মাদক দ্রব্য’ হিসেবে চিহ্নিত মারিজোয়ানা বা গাঁজা। কারও কাছে গাঁজা পাওয়া গেলে অনুমান, বিশ্বাস আর সন্দেহের ভিত্তিতেই টুকে দেয়া হচ্ছে মামলা। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন’ এ বার বার সংশোধনী আনা হলেও কমছে না মাদকের মিথ্যা মামলা।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মারিজোয়ানা বা গাঁজা মাদক দ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯০ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, অ্যালকোহল ব্যতীত অন্যান্য মাদকদ্রব্যের উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার হয় এমন কোনো দ্রব্য বা উদ্ভিদের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন বা পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না। এ আইন লঙ্ঘনের শাস্তির বিশদ বিবরণ রয়েছে ৩৬ ধারায়।
বলা হয়েছে, কোথাও পপি ফল বা পপির অঙ্কুরোদ্গম বীজ পাওয়া গেলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে কোথাও ১০টি বা তার কম পপি গাছ অথবা এই গাছের ফল বা বীজ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১ থেকে ৫ বছরের কারাদÐ ও অর্থদন্ড দেয়া যাবে। গাছের সংখ্যা ১১ থেকে ১০০ এর মধ্যে হলে ৫ থেকে ১০ বছরের কারাদÐ ও অর্থদন্ড এবং গাছের সংখ্যা ১০০ এর বেশি হলে কমপক্ষে ১০ বছর ও সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া যাবে।
গাঁজা বা ভাং গাছের শাখা-প্রশাখা, পাতা, ফুল ইত্যাদির দ্বারা তৈরি মাদকের পরিমাণ ৫ কেজি বা তার কম হলে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড, মাদকের পরিমাণ ৫ কেজি থেকে ১৫ কেজির মধ্যে হলে ৫ থেকে ৭ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড এবং মাদকের পরিমাণ ১৫ কেজির বেশি হলে ৭ থেকে ১০ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড দেয়া যাবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত এক যুগে বিভিন্ন সংস্থা মাদক আইনে মামলা করেছে ৮ লাখ ৩১ হাজার ১৩৩টি।
২০১৮ সালে বিশেষ অভিযানের পর ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৭৮টি মামলা হয়। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮টি। ২০২০ সালে করোনাকালে তা কমে হয়েছে ৮৫ হাজার ৭১৮টি। ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত হয়েছে ৩৭ হাজার ৭৫১টি। গত এক যুগে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৮ জন। ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩২৩ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৪৭। ২০২০ সালে কিছুটা কমে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৩।
জানা গেছে, ৪৮ দশমিক ৪৫ ভাগ মাদকের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। খালাস পেয়েছেন ৫১ দশমিক ১৮ ভাগ মামলার আসামি। খালাসপ্রাপ্ত ৬০ ভাগ আসামিই গাঁজা সেবন, উৎপাদন, পরিবহণ, বিপণনের সঙ্গে জড়িত-মর্মে অভিযোগ করা হয়েছিল।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, নিরীহ মানুষকে ‘ভিকটিমাইজ’ করার বিষয়টি ব্যতিক্রম। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় নিরপরাধ পাটকল শ্রমিক জাহালম কারাভোগ করেছেন। অন্যান্য সংস্থায়ও এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।