জীবন বীমার ওপর আস্থা হারাচ্ছে গ্রাহকরা

চট্টগ্রামে গ্রাহকদের হয়রানি করছে পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স

ভবিষ্যৎ জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য জীবন বীমা রাষ্ট্রের নাগরিকের একটি প্রতিরক্ষামূলক উপাদান। যেখানে প্রিমিয়াম হিসাবে ছোট অংকের অর্থ প্রদান করলে নির্দিষ্ট সময় শেষে বড় অংকের অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের হয়রানী এবং বীমা নিরসনে গড়িমসির কারণে দিন দিন প্রায় প্রতিটি ইন্সুরেন্স কোম্পানির ওপর আস্থা হারাচ্ছে গ্রাহকরা। ক্যাবের দাবি, সুশাসনের অভাবে সাধারণ গ্রাহকরা তাদের আমানত ফেরত পাচ্ছেন না।

মোহাম্মদ ইউসুফ পেশায় একজন গাড়ি চালক। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা ইউনিয়নের মৃত আবদুস সাত্তারের ছেলে। র্দীঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় বসবাসের সুবাধে পরিবারে ভবিষ্যৎ জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের বহদ্দারহাট সার্ভিসিং সেল শাখায় জীবন বীমা পলিসি করেন। ২০০৮ সালে ১৫ বছর মেয়াদী একক প্রকল্পের যার প্রতি কিস্তি ছিল ২৪৫০ টাকা। সঞ্চয় এবং অল্প লাভের আশায় খেয়ে না খেয়ে গ্রাহক ইউসুফ বীমা পলিসি নিয়মানুযায়ী টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ৮ মাস পার হলেও মূল টাকা পরিশোধে অনীহা প্রকাশ করছে বহদ্দারহাট সার্ভিসিং সেল শাখার কর্মকর্তা জেনারেল ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম। ফলে হতদরিদ্র গ্রাহক ইউসুফসহ শতশত গ্রাহকরা প্রতিকার চেয়ে বেড়াচ্ছেন কর্তৃপক্ষের দুয়ারে দুয়ারে। এমনকি মূল টাকা ফেরত চাইলে সরকার থেকে টাকা নিতে বলে এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলেন ভুক্তভোগি ইউসুফ। সর্বশেষ কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে গেল রবিবার (৩ ডিসেম্বর) রাতে চান্দগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরীও করেন তিনি। তবে ওই শাখার ব্যবস্থাপকের দাবিম আমরা চাইলে শতশত গ্রাহকের প্রাপ্য টাকা ফেরত দিতে পারব না। ঢাকার হেড অফিস থেকে চেক ইস্যু না হওয়া পর্যন্ত এটার কোনো সমাধান আমরা দিতে পারছি না।

শুধুই পপুলার নয়, এভাবে চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়।

সোমবার (৪ ডিসেম্বর) বিকালে ভুক্তভোগী ইউসুফ দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, আমি খেয়ে না খেয়ে ১৫ বছর আগে থেকে জীবন বীমার পলিসিতে টাকা জমা দিয়েছি। মেয়াদ শেষের ৮ মাস পার হলেও আমার মূল টাকা ফেরত দিচ্ছে না। টাকা ফেরত চাইতে গেলে সরকার থেকে নিতে বলে এবং হুমকি দেন। আমি অসহায় মানুষ, ৮ মাস ধরে অফিসে যাওয়া-আসা করছি, কিন্তু টাকা আজ-কাল দেবে দেবে বলে আমাকে ঘোরাচ্ছে। এমনকি টাকা ফেরত দেবেন বলে আমাকে আরেকটা ২৪৫০ টাকার পলিসিও করায়, কিন্তু এরপরও আগের মূল টাকা ফেরত দিচ্ছে না তারা। কোনো উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত থানার দারস্থ হই।

তিনি আরও বলেন, ম্যানেজার সাইফুল আমাকে বলে তোমার মতো গ্রাহক আমাদের প্রয়োজন নেই। টাকা যখন আসবে তখন ফেরত দেব। এর আগে চাইলে সরকার থেকে নাও। শুধু আমি না, আমার মতো বেশ কিছু গ্রাহক আমার মতো হয়রানির শিকার। আমি আমার কষ্টের টাকা ফেরত চাই এবং কর্মকর্তা নামের এই দুষ্কৃতকারীদের বিচার চাই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক গ্রাহক বলেন, তাদেরকে বিশ্বাস করে বীমার টাকা জমা দিয়েছি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যতবার অফিসে গেছি ততবারই ওরা বলে ঢাকা থেকে চেক আসেনি। কার কাছে গেলে এর সমাধান পাবো সেটাই বুঝতে পারছি না। শুধু আমি না, এ রকম অনেক গ্রাহক আছেন যারা মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও বীমার টাকা ফেরত পাচ্ছে না।

গ্রাহক হয়রানির বিষয়টি জানতে চাইলে পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের বহদ্দারহাট সার্ভিসিং সেল শাখার জেনারেল ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, আমাদের অনেক গ্রাহক তাদের পাওনা টাকার অপেক্ষায় আছে। তার মধ্যে ইউসুফ একজন। আমরা তাকে ঢাকার অফিস থেকে চেক আসলে দিয়ে দেব বলেছি।

আরেকটা বীমা কেন করালেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওই টাকা দুই বছর পর পেয়ে যাবে। গ্রাহকের বীমা মেয়াদ শেষ হলেও মাসের পর মাস কেন হয়রানি হচ্ছে এমন প্রশ্নে বহদ্দারহাট শাখার এই ম্যানেজার বলেন, বিভিন্ন কারণে আমাদের গ্রাহক কমে গেছে। এ কারণে ঢাকা অফিস চেকগুলো দ্রুত ছাড়ছে না। তাছাড়া ডিসেম্বরে সরকারকে বড় মূলধন দেখাতে গিয়ে গ্রাহকদের প্রাপ্য টাকা দিতে একটু দেরি হচ্ছে। আশা করছি, শীঘ্রই ভুক্তভোগীদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে পারব।

সাধারণ ডায়েরীর বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল কবির দেশ বর্তমানকে বলেন, ভুক্তভোগী আমার থানাধীন এলাকায় পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স নামক প্রতিষ্ঠানে বীমার মূল টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি ও হয়রানি উল্লেখ করে জিডি করেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে সত্যতা যাচাই করতে একটি টিম পাঠাবো এবং পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

হয়রানির বিষয়ে করণীয় কি জানতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হট লাইন নম্বরে ফোন করলে নাম পরিচয় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে এক কর্মকর্তা বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর বীমা নিরসনের দাবি লিখিত অভিযোগ করুন। এমন পরামর্শ দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আবারও ফোন করে পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্তার সাথে ইন্টারকমে সংযোগ দিতে বললে আজ অফিস সময় শেষ হয়ে গেছে বলে কাল সকাল ১০ টার পর ফোন করতে বলে আবারও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নন লাইফের সদস্য নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ওমর বিন খলিল দেশ বর্তমানকে বলেন, গতকাল (৩ ডিসেম্বর) মন্ত্রাণালয়ে একটা মিটিং হয়েছে শরীফ স্যারের অধীনে বীমা সেবা এবং নিরসনের উপায় নিয়ে। মিটিংয়ে গ্রাহকদের বীমার দাবি দ্রুত নিরসনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত শোকজ করা হচ্ছে। আমাদের পক্ষ থেকে হয়রানি বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। এ সময় তিনি গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রত্যেকটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ইনডিভিজ্যুয়াল অফিসার নিয়োজিত আছেন। হট লাইন নম্বর ১৬১৩০ তে ফোন করে অভিযোগ দিলে সমস্যার সমাধান হতে পারে বলেও জানান তিনি।

কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর এ দশা। সুশাসনের অভাবে আজকে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কেনা গোলাম। তারা কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় গ্রাহকরা হারাচ্ছে তাদের মূলধন, আস্থার সংকটে পড়েছে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো। দ্রুত সরকারকে এই ব্যাপারে নজর দিতে হবে। না হয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের টাকা নিয়ে এমন হরিলুট অব্যাহত রাখবে।

দেশ বর্তমান/এআই