জিম্মি করা চেক ডিজঅনার, একের পর এক মামলা দিয়ে প্রবাসীর স্ত্রীকে হয়রানি

‘খালি চেক নেয়ার কোন বৈধতা নেই’

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকা এবং জিম্মি করা চেক ডিজঅনার করে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে। চলতি বছরের ১৯ মে দুবাই প্রবাসী শাহ আলমকে বিদেশে জিম্মি করে তার স্ত্রীকে ভয় দেখিয়ে জোর পূর্বক চেক ও খালি স্ট্যাম্প নেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ঘটনার পর স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের হয়। মামলার তদন্তে চাঁদাবাজির চেষ্টা এবং জিম্মি করে খালি চেক ও স্ট্যাম্প আদায়ের সত্যতা পায় চান্দগাঁও থানা পুলিশ। এবার ওই খালি চেকে ইচ্ছামতো টাকার সংখ্যা বসিয়ে মামলা ও উকিল নোটিশ পাঠিয়ে হয়রানি ও বিভিন্নভাবে হুমকির অভিযোগ যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’। এদিকে, অলিখিত চেক ও স্ট্যাম্প নেয়া এবং তা অপব্যবহার করা জগন্য অপরাধ বলে মনে করছেন আইনজীবী মহল। অন্যদিকে, প্রতারণা ও সন্ত্রাসীদের থেকে রক্ষা চেয়ে আইনি প্রতিকার পেতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মামলার বাদি ও ভুক্তভোগী জান্নাতুল ফেরদৌস।

তিনি গতকাল বুধবার বিকালে দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘চলতি বছরের ১৯ মে আমার স্বামী শাহ আলমকে গলায় চুরি ধরে মারধর ও জিম্মি করে এবং আমার থেকে জোর করে ৭টি খালি চেক ও ৩টি অলিখিত স্ট্যাম্প নেয় সন্ত্রাসীরা। ওই দিন সন্ত্রাসীরা প্রথমে আমাকে মোবাইলে ফোন করে হুমকি দিয়ে বহদ্দারহাট কাশবন রেস্টুরেন্টের সামনে আসতে বলে। সন্ত্রাসী দিদার ও জোবায়ের চাঁদাবাজির উদ্দেশ্য নেওয়া চেক ডিজঅনার করে নোটিশ পাঠিয়ে মামলা দিয়ে শেষ করে দেয়ার হুমকি দেন। ইতোমধ্যে সাব্বির হাসান নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে ২টি মামলা ও দুইটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। আমার প্রতিবন্ধি ছেলেকে নিয়ে বর্তমানে আমার বড় ভাইয়ের বাড়িতে আছি। ছেলের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা লোন নিয়েছি যা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি। এমন অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে। তারা ছিনতাই হওয়া চেকের বিপরীতে নোটিশে উল্লেখ করেছে, আমার সাথে তাদের ব্যববসা-বাণিজ্য রয়েছে। অথচ তাদেরকে আমি ভাল করে চিনিও না। ঘটনার পরে জানতে পারি তারা চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার ৭ নং জিরি ইউনিয়নের এখলাছুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ও তার সহযোগী জোবায়ের। এখন তারা চাঁদাবাজি করতে না পেরে বিভিন্নভাবে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকিও দিচ্ছে। প্রবাসে থাকা আমার স্বামীর তেমন আয় না থাকায় খুবই অর্থাভাবে আছি। এমন সময়ে প্রতারণামূলক হয়রানি থেকে বাঁচতে না পারলে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমি সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের বিচার চাই।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে লেখা আছে, মামলার আসামীরা বাদীর স্বামী বিদেশ থাকায় প্রায় সময় চাঁদা দাবী করত। বাদীকে প্রথমে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বলে। পরে গত ১৯ শে মে তাদের ব্যবহারের মোবাইল থেকে ফোন করে প্রবাসীর গলায় চুরি ধরে মেরে ফেলার হুমকি ও ফাঁদে ফেলে সন্ত্রাসী কায়দায় মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ও তার সহযোগী জোবায়ের জোর করে স্বাক্ষর করা খালি চেক ও খালি স্ট্যাম্প নেন। যাহা তদন্তকালিন সময়ে সিসিটিভি ফুটেজ ও সিডিএস পর্যালোচনায় সত্যতা পাওয়া যায় এবং চেক নম্বর উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের শেষের দিকে লেখা আছে, ‘আলোচ্য মামলার গোপন প্রকাশ্যে তদন্তে, সাক্ষ্য প্রমাণে আলমতদৃষ্টে ঘটনার  পারিপার্শ্বিকতা এজারহার নামীয় গ্রেফতারকৃত ১ নং আসামী মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম (৪২) এজাহার নামীয় বিজ্ঞ আদালতে হতে জামিন প্রাপ্ত আসামী ২ নং জোবায়ের প্রকাশ জুবায়েদ (৩৩) ও অজ্ঞাত ১ জনের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ পেনাল কোড-৩৮৫/৩৮৬/৫০৬ সত্য প্রমাণিত হয় (বর্তমানে উভয় আসামী জামিনে আছেন)। অজ্ঞাত নামা ১ জন আসামী সনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগপত্র সম্ভব হচ্ছে না, ভবিষ্যতে পাওয়া গেলে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) সভাপতি জিয়া হাবীব আহ্সান বলেন, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে জিম্মি করে চেক আদায় উল্লেখ থাকার পরও ডিজঅনার করে মামলা দিয়ে হয়রানি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা মানবাধিকার লঙ্গনের সামিল। এভাবে প্রবাসীর স্ত্রীকে জিম্মি করে মামলা দিয়ে হয়রানি করা উচিত নয়। আমাদের কাছে ভুক্তভোগী আসলে আইনি প্রতিকার দিতে চেষ্টা করব।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে বলেন, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে জিম্মি এবং চাঁদা উল্লেখ থাকলেও বিবাদী পক্ষ তা মানতে রাজি না হওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়ে উঠছে। এ বিষয়টি আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে সমাধান দিতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন এই সিনিয়র আইনজীবী।

চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আইনজীবী মো. আব্দুর রশিদ দেশ বর্তমানকে বলেন, কেউ কারও থেকে খালি চেক নেয়ার কোনো বৈধতা এবং ভিত্তি নেই। কোন বিষয়ে চেক নিলে তা অবশ্যই টাকার সংখ্যা উল্লেখ করে নিতে হবে। এভাবে খালি চেক দিয়ে দাতা এবং তা নিয়ে গ্রহীতাসহ উভয়ে অন্যায় করেছেন। খালি চেক নিয়ে ইচ্চামতো সংখ্যা লিখে মামলা করা অন্যায়। এটি পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করলে এই মামলা কোনো দিন টিকবে না।

তিনি বলেন, খালি চেক নিয়ে ইচ্চামতো টাকার সংখ্যা বসিয়ে মামলা করা অন্যায় এবং প্রতারণা বলে সাব্যস্ত হবে।