ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশি জাহাজটিকে সোমালিয়া উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনার দুই দিন পর সোমালিয়া উপকূূলে নোঙর করেছে বাংলাদেশি কোম্পানির মালিকানাধীন জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। তবে এখনও দস্যুরা তাদের দাবী কিংবা চাওয়া-পাওয়া কিছুুই জানাইনি। দুস্যদের কথামতো চলায় এখনও ভালো আচরণ করছে তারা। এখন পর্যন্ত বাঁধা দেয়নি রোজার সেহেরি ও ইফতারে। এদিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে জাহাজে থাকা ২৩ নাবিকের স্বজনরা। জাহাজটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম’র পক্ষে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে জাহাজসহ নাবিকদের ফেরাতে তৎপরতা শুরু করেছেন। পাশাপাশি সরকারিভাবে শুরু হয়েছে এ বিষয়ে দাফতরিক কার্যক্রম।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দস্যুতার শিকার জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলে পৌঁছানোর পর, নোঙর করেছে বলে দৈনিক দেশ বর্তমানকে নিশ্চিত করেছেন কেএসআরএম’র গণমাধ্যম উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, আজ দুপুরে (বৃহস্পতিবার) আমরা নিশ্চিত হয়েছি জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলে গারাকাদ বন্দরের অদূরে জলদস্যুদের ‘সেইফ জোনে’ নোঙ্গর করেছে।
এদিকে জাহাজে জিম্মি এক নাবিক বুধবার রাত ১১টার দিকে তার পরিবার এবং মালিকপক্ষের কাছে অডিওবার্তা পাঠিয়ে তাদের সর্বশেষ অবস্থা জানিয়েছে। মিজানুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, নাবিকের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করছি না। তবে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, নাবিকরা সবাই অক্ষত আছেন। জলদস্যুরা তাদের ওপর শারীরিক কিংবা মানসিক কোনো ধরনের চাপ এখনও পর্যন্ত প্রয়োগ করছে না। ইতোমধ্যে জেনেছি নাবিকরা সবাই স্বাভাবিকভাবেই রোজা রাখতে পারছেন। তাদের সেহেরি এবং ইফতারে পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। জাহাজেই ২০-২৫ দিনের খাবার ও ২০০ টন পানি মজুত আছে। সেগুলো জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নাবিকদের খাবার-পানি ব্যবহারে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, এখানে তিনটা পক্ষ আছে। আমরা একটা পক্ষ, আমাদের সঙ্গে দেশের সরকার আছে। আরেকটি পক্ষ বীমা প্রতিষ্ঠান এবং জলদস্যুদের প্রতিনিধি হিসেবে তৃতীয় পক্ষ। আমাদের সঙ্গে মূলত যোগাযোগ হবে তৃৃতীয় পক্ষের। এনিয়ে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। সরকারিভাবে এ বিষয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে দাফতরিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। নাবিকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় ফেরত আনার বিষয়ে কেএসআরএম’র অবস্থান অটুট আছে বলেও জানান তিনি।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে ২৩ নাবিকসহ বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটি সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জলদস্যুরা জাহাজের নাবিকদের জিম্মি করেছে। মঙ্গলবার বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে জাহাজের নাবিকরা তাদের স্বজন ও মালিকপক্ষের কাছে অডিওবার্তা পাঠান। এতে জিম্মি করা হলেও তাদের কোনো ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে না বলে নাবিকরা জানান।
জাহাজে থাকা নাবিকেরা হলেন- জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, চীফ অফিসার আতিকুল্লাহ খান, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, থার্ড অফিসার এন মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন, চীফ ইঞ্জিনিয়ার এ এস এম সাইদুজ্জামান, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলাম, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ, ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান, ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ এবং ক্রু মো. আনোয়ারুল হক, মো. আসিফুর রহমান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, জয় মাহমুদ, মো. নাজমুল হক, আইনুল হক, মোহাম্ম শামসুদ্দিন, মো . আলী হোসেন, মোশাররফ হোসেন শাকিল, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. নুর উদ্দিন ও মো. সালেহ আহমদ।
বিএমএমওএ জানিয়েছে, জিম্মি নাবিকদের মধ্যে ১১ জন চট্টগ্রামের ও ২ জন নোয়াখালীর। বাকি ১০ জন যথাক্রমে ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, খুলনা, নেত্রকোনা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বরিশাল জেলার।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে জাহাজটি সংযুক্ত আরব-আমিরাতের দুবাইয়ের আল-হামরিয়া বন্দরে যাচ্ছিল। ১৯ মার্চ গ্রিনিচ সময় রাত ৮টায় জাহাজটি সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ছিল। কেএসআরএম গ্রুপের মোট ২৩টি জাহাজ আছে, যেগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করছে। গোল্ডেন হক নামে পরিচিত এমভি আবদুল্লাহ গত বছর কেএসআরএম গ্রুপের মালিকানায় আসে।
এর আগে, ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের উপকূলে আরবসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জাহাজ ‘এমভি জাহান মণি’। ওই জাহাজের ২৫ বাংলাদেশি নাবিকের পাশাপাশি এক ক্যাপ্টেনের স্ত্রীসহ ২৬ জনকে ১০০ দিন জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। সরকারি উদ্যোগসহ নানা প্রক্রিয়ায় ২০১১ সালের ১৪ মার্চ জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়। ১৫ মার্চ তারা বাংলাদেশে ফিরে আসেন।