ভুয়া ওয়ারিশ সনদ বানিয়ে ‘মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প’র ভূমি অধিগ্রহণ তথা ক্ষতিপূরণের ৩০ লাখ টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায়। মূূলত মৃত শফিউল আলমের জৈষ্ঠ পুত্র সলিমুল্লার স্থলে আবুল খায়েরের নাম বসিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন প্রতারণা করে করে চক্রটি। ভুক্তভোগীর দাবি, জালিয়াত কাণ্ড ও লোপাটের ঘটনায় ১১ নং মঘাদিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সরাসরি জড়িত। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। এদিকে ওয়ারিশ সনদ জালিয়াতি করে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেললে জড়িত কাউকে ছাড় দেবেন না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সাংসদ মাহবুব উর রহমান রুহেল।
গতকাল বুধবার বিকালে দৈনিক দেশ বর্তমানকে ভুক্তভোগী সলিমুল্লা প্রকাশ দিদার বলেন, ১৯৮৪ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর ঘরের বড় ছেলে হিসাবে কৃষি কাজ করে সংসারের হাল ধরি। বাবা মারা যাওয়ার পরপরই ছোটবোন মারা যায়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে মাসহ ছোট ভাইদের মানুষ করি। ২০১৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাবার ওয়ারিশন সনদে মায়ের পর আমার নাম ছিল। ২০২০ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া ওয়ারিশ সনদে দেখি আমার নামের স্থলে আবুল খায়ের নামে এক অচেনা ব্যক্তির নাম। ওই জাল ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করে আমার প্রাপ্য প্রায় সাড়ে ৩০ লাখ টাকা লোপাট করে চক্রটি। যেখানে ১১ নং মঘাদিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সরাসরি জড়িত এবং তার পরিকল্পনায় এটা হয়েছে। টাকা আত্মসাৎ করায় ছোট দুই ভাইসহ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করি। গত বছরের ৬ মার্চ তদন্ত রিপোর্ট দেন পিবিআই। যেখানে পিবিআইকে ম্যানেজ করে তার পক্ষে রিপোর্ট নেন চেয়ারম্যান। তদন্ত রিপোর্ট পক্ষপাত হওয়ায় আদালতে না রাজি দিয়েছি। মামলা করায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে চেয়ারম্যান। আমি আমার পাওনা ফিরে পেতে আমাদের এলাকার সম্মানিত সাংসদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
দেশ বর্তমানের তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরসরাই উপজেলার ১১ নং মগাদিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাফরাবাদ এলাকার মৃত হেরাজুল হকের পুত্র শফিউল আলম ১৯৮৪ সালে মারা যান। মৃত্যুর সময় এক স্ত্রী ও ১ কন্যাসহ চার সন্তান রেখে যান তিনি। যেখানে জৈষ্ঠ পুত্র ছিলেন সলিমুল্লা প্রকাশ দিদার। ২০১৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাবার ওয়ারিশন সনদে নাম থাকলেও দ্বিতীয়বার ২০২০ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওয়ারিশ সনদপত্রে আবুল খায়ের নামে অন্য এক ব্যক্তির নাম অন্তর্ভূক্ত হয়। দেশ বর্তমানের হাতে আসা আবুল খায়েরের জাতীয় পত্রে বাবার নাম মিল থাকলেও মায়ের নাম নাসিমা বেগমের স্থলে আছে হোনদন বেগম। এছাড়া প্রথম ওয়ারিশ সনদ অনুযায়ী দ্বিতীয় ওয়ারিশ সনদে সফিউল আলমের স্ত্রী নাসিমা বেগম, পুত্র মো. নজরুল ইসলাম ও ছোট ছেলে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আইডিতে হোনদন বেগম থাকলেও ওয়ারিশ সনদে নাসিমা বেগম এবং ঠিকানায় অনেকটা অমিল থাকায় ওয়ারিশ সনদে নয়ছয় ষ্পষ্ট।
২০২১ সালে ১৫ই নভেম্বর ভূমি অধিগ্রহণ শাখা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চট্টগ্রাম কর্তৃক শুনানির নোটিসে পাঁচ নম্বরে আবুল খায়ের এল এ চেক নম্বর ১১৫৫৭৪ নং গ্রহীতা ছিলেন। মোবাইল নম্বর উল্লেখ আছে ০১৮২১৫৭১৮৫৭ । মোবাইল ফোনটি বর্তমানে বন্ধ।
২০২১ সালে ১৫ই নভেম্বর ভূমি অধিগ্রহণ শাখা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. রায়হান মেহবুব স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে দেখা যায়, পাঁচ নম্বরে আবুল খায়ের এল এ চেক নম্বর ১১৫৫৭৪ নং গ্রহীতা ছিলেন। মোবাইল নম্বর উল্লেখ আছে ০১৮২১৫৭১৮৫৭। এই ফোন নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ। অথচ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এল এ শাখায় ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিলের একটি আবেদনে মুল ওয়ারিশের নামে সলিমুল্লার নাম ছিল ২ নম্বরে।
এর আগে ২০২০ সালের ২ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে ৩০ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৫ টাকা উত্তোলনের সময় স্বাক্ষী ছিলেন আজিজুল (অস্পষ্ট) নামের এক ব্যক্তি। যেটির ফরম নম্বর ছিল ২৪৯৬। এল এ মামলা নম্বর ০৬/২০১৬-২০১৭ ফরম নম্বর ছিল ১১৫৫৭৪ এবং শিরোনাম ছিল ‘মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প’। অথচ এর আগে মৃত শফিউল আলমের পুত্র হওয়ায় বাবার সম্পত্তির অধিগ্রহণ বাবদ ৭৬ হাজার টাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় চট্টগ্রাম এল এ শাখা থেকে উত্তোলন করেন।
বিষয়টির সত্যতা জানতে গতকাল বুধবার দুপুরে মিরসরাই উপজেলার ১১নং মাথা দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের মুঠো ফোন থাকায় হোয়াটসঅ্যাপে বার বার কল দিলেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় মন্তব্য নেওয়া যায়নি।
ওয়ারিশ সনদে জালিয়াতি করে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বশর মোহাম্মদ ফোখরুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর তদন্ত করে সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব উর রহমান রুহেলের নজরে আনলে তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, বিষয়টি প্রথম শুনেছি। ওয়ারিশ সনদ জালিয়াতি করে ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণ মেললে অভিযুক্তদের কোনো ছাড় দেব না।
দেশ বর্তমান/এআই