পাঁচ বছর আগে জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এরপর কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পাইপলাইন দিয়ে চট্টগ্রামে গ্যাস আসতো, সেটা দিয়ে এখন মহেশখালীর মাতারবাড়ি থেকে এলএনজি যাচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম এখন পুরোপুরি এলএনজি নির্ভর। কিন্তু এলএনজি টার্মিনাল থেকে কোনো কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কী হবে?
এলএনজির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরিস্থিতি কী হতে পারে সেই চিত্র চট্টগ্রামবাসী দেখেছে গত ১২ মে থেকে ১৪ মে। তখন ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’র কারণে তিনদিন মহেশখালীতে থাকা ভাসমান দুটি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে চট্টগ্রামে বিপর্যয় নেমে আসে। তিন দিন ধরে চট্টগ্রামের লাখো বাসায় চুলা জ্বলেনি, ফিলিং স্টেশনের সামনে পড়েছিল গাড়ির দীর্ঘসারি, রাস্তায় ছিল না গণপরিবহন, ধস নামে কলকারখানার উৎপাদনে। পুরো চট্টগ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয় হাহাকার। বিকল্পবিহীন এলএনজি নির্ভর গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় চট্টগ্রামবাসী।
এরপর চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিকরা জাতীয় গ্রিডের সাথে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে সংযুক্ত রাখার দাবিতে তোলেন। গত ১৭ মে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কার্যালয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খানের সাথে। সেই বৈঠকে ব্যবসায়ীরা এলএনজির পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সাথেও চট্টগ্রামকে সংযুক্ত রাখার দাবি জানান। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার খবর জানা যায়নি।
চট্টগ্রামে এলএনজির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ বর্তমানকে বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীতে কোনো অবস্থায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে না। ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’র সময় তিনদিন চট্টগ্রামকে এলএনজি থেকে বিচ্ছিন্ন করে অচল করে ফেলা হয়। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে চট্টগ্রামকে পুরোপুরি এলএনজি নির্ভর করে ফেলাটা সরকারের অদূরদর্শী পদক্ষেপ। চট্টগ্রামে কোনো কারণে এলএনজির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তখন জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা উচিত। ’
তবে কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকতারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হলো ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল। এলএনজি রিজার্ভে রাখার জন্য মহেশখালী মাতারবাড়িতে ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপন করতে হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) মাতারবাড়িতে ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সরকার এখনো এই টার্মিনাল স্থাপনের অনুমোদন দেয়নি। অনুমোদন পেলে ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপন ও অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভূমিভিত্তিক টার্মিনালে এক থেকে দেড় মাসের গ্যাস রিজার্ভ করে রাখা যাবে। তখন সেখানে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সেই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা যাবে।
চট্টগ্রামকে একসঙ্গে এলএনজি ও জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযুক্ত রাখার সুযোগ আছে কি?
জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে ফৌজদারহাটে জাতীয় গ্রিডের যে লাইন থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ করা হতো, সেই লাইন দিয়ে এখন ঢাকায় এলএনজি যাচ্ছে। এই অবস্থায় চট্টগ্রামকে এলএনজির পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযোগ করার কি কোনো সুযোগ আছে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আমিনুর রহমান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে এলএনজির পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের লাইন সংযোগ দিতে হলে ফৌজদারহাট সিটি গেট স্টেশনে টেকনিক্যাল কিছু কাজ করতে হবে, যা একটু জটিল। তবে এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া হবে না।’
মহেশখালী থেকে কীভাবে এলএনজি সরবরাহ হয়?
প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের তাপমাত্রা কমিয়ে -১৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে গ্যাস তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই এলএনজি (লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) বলা হয়।
উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, এলএনজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ৬০০ লিটার গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তরিত করে মাত্র এক লিটারের ছোট্ট একটা বোতলে ভরে ফেলা যায়। এ জন্যই একসাথে অনেক বেশি এলএনজি জাহাজে করে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করা যায়। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এলএনজি প্লান্ট কাতারে অবস্থিত। প্লান্ট থেকে উৎপাদনের পর এলএনজিকে ট্যাংকে জমা করা হয়। ট্যাংক থেকে জেটিতে পাঠানো হয় জাহাজে তোলার জন্য। আমদানিকারক জেটিতে জাহাজ পৌঁছলে এলএনজিকে সেখান থেকে নামিয়ে টার্মিনালে রাখা হয়। এই টার্মিনালকে বলা হয় ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)। সেখানে তরল গ্যাসকে স্বাভাবিক গ্যাসে পরিণত করে তা পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়।
মহেশখালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ও দেশীয় সামিট গ্রুপের দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এই দুটি টার্মিনাল থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়।
কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনোয়ারায় একটি সিজিএস (সিটি গেট স্টেশন) রয়েছে। সেই স্টেশন থেকে চট্টগ্রামে সরাসরি এলএনজি সরবরাহ করা হয়। আনোয়ারা থেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ফৌজদারহাট সিজিএস পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়। ফৌজদারহাট সিজিএস থেকে সেই পাইপ লাইনটি জাতীয় গ্রিডের লাইনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। জাতীয় গ্রিডের সেই পাইপ লাইন দিয়ে আগে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট মহেশখালী মাতারবাড়ির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীর ভাসমান দুটি টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামে আসে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকি ৪০০-৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়া হয়।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাসের মোট গ্রাহক-সংযোগ ৬ লাখ ১ হাজার ৯১৪টি। এর মধ্যে গৃহস্থালি সংযোগ ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১টি, বাকিগুলো শিল্প-বাণিজ্যসহ অন্য খাতে। এসব খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ২৭৫ থেকে ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
চট্টগ্রামের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস না এলএনজি ভালো?
কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাঁচ বছর আগে জাতীয় গ্রিড থেকে যখন চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো, তখন গ্যাসের চাপ কম থাকতো। এতে চট্টগ্রামের বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু মহেশখালী মাতারবাড়ির ভাসমান টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ করার পর চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপজনিত এই সমস্যা দূর হয়ে যায়। বরং গ্যাস সরবরাহ লাইনে চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। জাতীয় গ্রিড থেকে মুখ ফিরিয়ে এলএনজির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পর গত পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রামে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
শুধু গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির কারণে নয়, গুণগত মানের দিক থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে এলএনজি নিরাপদ বলে জানিয়েছেন কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আমিনুর রহমান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘এলএনজি বর্ণহীন, গন্ধহীন, যা ব্যবহারে দূষণ কম হয়। আর এএলএনজি শতভাগ বিশুদ্ধ। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাস শতভাগ বিশুদ্ধ নয়। এটি জীবাশ্ম জ্বালানী, যা পচন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এলএনজিকে শতভাগ পরিশোধিত করে তরল করা হয়। শতভাগ বিশুদ্ধতার কারণে বিশে^র বিভিন্ন দেশে এলএনজি ব্যবহার করা হয়। এলএনজি হলো মিনারেল ওয়াটারের মতো আর প্রাকৃতিক গ্যাস হলো টিউবওয়েলের পানির মতো।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে আগে যখন জাতীয় গ্রিডের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তখন বিভিন্ন কলকারখানায় নানা সমস্যা দেখা দিতো। কিন্তু এখন এলএনজিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। চট্টগ্রামে যে সরাসরি এলএনজির সংযোগ রয়েছে, এটা চট্টগ্রামবাসীর জন্য সৌভাগ্য। জাতীয় গ্রিডের লাইনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিনিয়ত সমস্যা দেখা দেয়।’
এমএফ