চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আসলে প্রথমেই নাম আসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বিদ্যুৎ উপ-বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশের নাম। নগরীতে সড়কবাতি নিয়ে বিদ্যুৎ শাখার অসহযোগিতা, ২৬০ কোটি টাকার স্মার্ট এলইডি লাইট প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি, সরকারী কর্মকর্তা হয়ে আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘স্কাই প্রপার্টিজ’ নির্মাণের অংশীদার হওয়া এবং টাকা আত্মসাতসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ঝুলন কুমার দাশ। এবার ২০১৯ সালে জাইকার অর্থায়নে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে টেন্ডারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্ত করছে দুদক।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চসিকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযানে যায় দুদকের একটি টিম। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অভিযানের নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম দুদক কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক। অভিযানকারী দলটি প্রথমে ঝুলন কুমার দাশের ৪১৬ নম্বর রুমে গিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করে। পরে ঝুলন দাশকে নিয়ে দুদকের টিম নির্বাহী প্রকৌশলী তাসমিয়া তাহসিনের রুমে (৩০৩ নম্বর কক্ষ) যান।
এদিকে, ঝুলন কুমার দাশের বিরুদ্ধে জাইকার এলইডি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল শুরু থেকেই। যেখানে একটি বৈদ্যুতিক পোলে উচ্চতা কমিয়ে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটে। চসিকের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও জাইকা এলইডি প্রকল্পে মানহীন ক্যাবল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর ঝুলন কুমার দাশ নিজ উদ্যোগে চুয়েটের ল্যাবে পুনরায় ক্যাবল পরীক্ষা করে ‘মানসম্পন্ন’ ক্যাবলের রিপোর্ট নথিভুক্ত করেছেন। এ কারণে গত বছরের আগস্টে শোকজও খান এই প্রকৌশলী।
অভিযানের নেতৃত্বদানকারী দুদকের সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক দেশ বর্তমানকে বলেন, ২০১৯ সালে জাইকার অর্থায়নে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে টেন্ডারে অনিয়ম, নিজের পছন্দমতো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়াসহ দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানে এসেছি। অভিযানে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ই-জিপিতে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে কিছুই দেখাতে পারেননি। তাছাড়া টেকনিক্যাল প্রস্তাবের পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত কোনো কপি দেখাতে পারেনি। এ সংক্রান্ত আরও কিছুকাগজপত্র আমরা চেয়েছি। সেগুলো যাছাইবাছাই শেষে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দুদক প্রধান কার্যালয়ে পাঠাবো। তারপর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও অন্যান্য দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ আসলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থার নেওয়ার কথাও জানান দুদকের এই সহকারী পরিচালক।
জানা যায়, গেল জুন মাসে জনৈক নাসির উদ্দীন কুতুবী দুদকে প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশের বিরুদ্ধে ‘স্কাই প্রফার্টিজ’ নামক একটি রিয়েল স্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থেকে সিটি কর্পোরেশনে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা দেন। সেই অভিযোগেও প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশের বিরুদ্ধে তদন্ত নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। যেখানে চুক্তি অনুযায়ী ভবন মালিকদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো টাকা আত্মসাৎ করেছেন ঝুলন কুমার দাশ। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৪ জুন দুদকে অভিযোগ দেন নাসির উদ্দিন কুতুবী নামের ওই ব্যক্তি। সেই অভিযোগের তদন্তে অভিযানে নামে দুদক টিম।
এছাড়া চট্টগ্রাম নগর জুড়ে ডিজিটাল আলোকায়ন চার স্তরের সকল যন্ত্র ও লাইট ইউরোপের ভালো ব্র্যান্ডের সরবরাহ করার কথা বললেও মূলত সেসব জিনিস ভারত থেকে আনা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ উপ-বিভাগে নানা দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২৬০ কোটি টাকার স্মার্ট এলইডি লাইট প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে প্রকল্প পরিচালক ঝুলন কুমার দাশের বিরুদ্ধে। প্রকল্প পরিচালক ঝুলন কুমার দাশ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ দেবার জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুমদিত ডিপিপি পরিবর্তন করে ফেলেন। ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প পরিচালক ঝুলন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় দুতাবাসে অভিযোগ করেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সড়কবাতি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নেওয়া ২৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতি অনিয়ম ও অদক্ষতার অভিযোগে শোকজ করা হয়েছিল প্রকল্প পরিচালক ও চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ঝুলন কুমার দাশকে। ঝুলনের পছন্দের প্রতিষ্ঠানটি কালো তালিকাভুক্ত বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে দরপত্রের নথি ‘গায়েব’ করে নতুন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নথি যুক্ত করার মতো মহাজালিয়াতির ঘটনা ঘটানো হয়। অনিয়মের পক্ষে সাফাই বক্তব্য দিয়ে পুরো সিটি কর্পোরেশনকেই বিতর্কের মধ্যে ফেলেছেন তিনি। এমনকি জাইকার এলইডি প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে সিটি করপোরেশনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি।