চলাচল কিংবা দূরে কোথাও ভ্রমণের জন্য যাত্রীদের সড়ক ও নদীপথের চেয়ে অনেকটা নিরাপদ বাহন হিসাবে বিবেচিত রেলপথ তথা ট্রেন ভ্রমণ। কিন্তু সম্প্র্রতি ঢাকা-কক্সবাজার রেওলওয়ে রুটে চলন্ত ট্রেনে বেশ কয়েকবার পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় অনেকটা আতঙ্ক রূপ নিয়েছে যাত্রীদের মাঝে। এই রুটের চকরিয়া, সাতকানিয়া ও আশপাশের এলাকায় তিনমাস ধরে বেড়েছে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। এতে ট্রেনের কাচ ভেঙে আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। পাথর নিক্ষেপ বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রাম অভিমুখী কক্সবাজার স্পেশাল-০৪ চকরিয়া ছাড়ার পরে জানালা দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে আহত হন একজন যাত্রী। সম্প্রতি সবচেয়ে বড় পাথর নিক্ষপের ঘটনা ঘটে গত ৯ এপ্রিল রাতে। যেখানে ঢাকাগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ হারবাং, সাতকানিয়া, দোহাজারী, কাঞন নগর, লোহাগাড়া এবং পটিয়া পর্যন্ত অনবরত পাথর নিক্ষেপ করেছে বলে জানান চকরিয়া স্টেশন মাস্টার ফরহাদ বিন জাফর। এর ৪ দিন আগে গত ৪ এপ্রিল রাত নয়টার দিকে ঢাকাগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চকরিয়া অতিক্রমের সময় তিন জায়গায় পাথর নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ আহত না হলেও কোচের তিনটি গ্লাস ভেঙে যায়। এছাড়া ক্রমান্বয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়েছে। এতে শিশুসহ একাধিক যাত্রী আহতের পাশাপাশি ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এর আগে দিনের বেলা পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি রাতের বেলা প্রায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করছে দুর্বৃত্তরা।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়ে যাওয়া চকরিয়া, হারবাং, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া স্টেশনে রেলওয়ে নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত রেলওয়ে পুলিশ নিয়োগ নেই। প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে এসব এলাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকরিয়া, হারবাং, কাঞ্চননগর, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকায় বেশী পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। গত জানুয়ারি মাস থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৯০-১০০ এর অধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। তবে ফেব্রুয়ারী ও মার্চের পর থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজার রেললাইনটি বিলের মাঝখানে বয়ে গেছে। রেললাইনের আশপাশের কয়েকমাইল পর্যন্ত কোনো বসতি নেই। মাঝেমধ্যে দিনের বেলায় ঘুরতে আসা লোকজনের সমাগম হলেও জনমানবশূন্য এলাকায় রাতের বেলা লোকজন থাকার কথা নয়। কিন্তু সেখানে রাত নয়টার সময় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। তাদের মতে, এটি মাদকসেবী অথবা কোন স্বার্থান্বেষী মহলের যড়যন্ত্র হতে পারে। কেননা মাদকসেবিরাও নিয়মিত পাথর নিক্ষেপ করার কথা নয়। হয়তো কোন স্বার্থান্বেষী মহল স্বার্থ উদ্ধারে রেলে পাথর নিক্ষেপের মত ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সাতকানিয়া এলাকার বাসিন্দা শরীফ নামের একজন বলেন, পাথর নিক্ষেপের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে এটি কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। অনেক সময় শিশুরা দুষ্টুমি করে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে। কিন্তু জনমানবশূন্য এলাকায় রাতের বেলা ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
চকরিয়া স্টেশন মাস্টার ফরহাদ বিন জাফর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, গত বুধবারের ঘটনা এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেনি তবে গেল ৯ এপ্রিল ঢাকাগামী পযটক এক্সপ্রেস হারবাং, সাতকানিয়া, দোহাজারী, কাঞন নগর, লোহাগাড়া এবং পটিয়া পর্যন্ত অনবরত পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর আগে ৪ এপ্রিল রাত নয়টায় ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেসে চকরিয়াসহ একাধিক জায়গায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। যারা একাজে জড়িত তারা হয়তো কোন মাদকসেবি বা অন্য কেউ এ কাজ করছেন। এছাড়া প্রায় সময় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আমরা শুনি। পাথর নিক্ষেপ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন স্যারদের জানিয়েছি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে আমরা ও পুলিশ নিয়মিত সচেতনতা ও প্রচারণা চালায়। সম্প্রতি ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়ে গেছে। গরমের তীব্রতাপদাহ কমলে শীঘ্রই এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যেমে প্রচারণা চালাবো এবং আইনি পদক্ষেপ নেব।
চট্টগ্রাম জেলা রেলওয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, অনেক সময় ছোট শিশুরা দুষ্টুমি করে পাথর নিক্ষেপ করে যা তাদের পারিবারিক শিক্ষার অভাব। পাথর নিক্ষেপ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব কারা এগুলো করছে এবং এ ঘটনায় জড়িত কারা। আমরা সচেতনতার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেব।
দেশ বর্তমান/এআই