চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ: তিন বছর মেয়াদী কমিটি পার করল ১০ বছর
২৯১ সদস্যের কমিটিতে ৯৮ ভাগ নেতারই এখন ছাত্রত্ব নেই, ৭৫ ভাগ নেতা বিবাহিত
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কমিটি আসে-যায়, কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরের কমিটি পাল্টায় না। তিন বছর মেয়াদের কমিটি ১০ বছর পার করে দিয়েছে। অথচ এই সময়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের চারটি কমিটি পরিবর্তন হয়েছে। এখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানের নেতৃত্বে সংগঠনটি চলছে। সেই হিসাবে বলতে গেলে কেন্দ্রীয় পাঁচটি কমিটির মেয়াদ পার করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ১০ বছর আগের কমিটি।
ছাত্রলীগের কেন্দ্র থেকে ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ইমরান আহমেদ ইমুকে সভাপতি ও নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৪ জনের আংশিক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১১ জুলাই ওই ২৪ জনসহ ২৯১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ নগর ছাত্রলীগের কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এরপর নুরুল আজিম অব্যাহতি নিলে তার স্থলাভিষিক্ত হন জাকারিয়া দস্তগীর।
জানা যায়, ২০১৩ সালে ইমু-রনি কমিটির অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। ওই কমিটির পর ২০১৫-২০১৮ মেয়াদে মো. সাইফুর রহমান সোহাগ সভাপতি ও এস এম জাকির হোসাইন সাধারণ সম্পাদক, ২০১৮-১৯ মেয়াদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সভাপতি ও মো. গোলাম রাব্বানী সাধারণ সম্পাদক, ২০১৯-২০২২ মেয়াদে আল নহিয়ান খান জয় সভাপতি ও লেখক ভট্টাচার্য সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সাদ্দাম হোসেন সভাপতি ও শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও তাঁতি লীগের সম্মেলন হয়েছে। এখন নগর আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন চলছে। ওয়ার্ড ও থানা কমিটির পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে। কিন্তু নগর ছাত্রলীগের কমিটির ১০ বছর হতে চললেও সম্মেলনের বিষয়ে কোনো সাড়া শব্দ নেই।
নগর ছাত্রলীগ নেতাদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘ ১০ বছর সম্মেলন না হওয়ার কারণে সংগঠনটি এখন আইসিইউতে চলে গেছে। অপরাধ, অছাত্র, অন্তঃকোন্দল ও দাম্পত্য জীবনের চাপে ন্যুব্জ ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিট।
গত এক বছরে নগর ছাত্রলীগ কাগজে-কলমে বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠন করলেও মাঠে-ময়দানে সংগঠনটির দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। তৃণমূলে ধসে পড়েছে সাংগঠনিক কার্যক্রম।
ছাত্রলীগ ছাত্র ও অবিবাহিতদের সংগঠন হলেও সংগঠনটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ২৯১ সদস্যের কমিটিতে ৯৮ ভাগ নেতারই এখন ছাত্রত্ব নেই। ৭৫ ভাগ নেতা বিবাহিত।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি রেজাউল আলম রনি বলেন, ‘নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিতে লজ্জা হয়। কারণ আমার ছাত্রত্ব নেই। বিয়ে করে সংসার করছি। আমি চাই নতুনদের হাতে আসুক ছাত্রলীগের নেতৃত্ব।’
নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঈনুর রহমান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘১০ বছর পদবিতে আছি। দুই বাচ্চার বাবা হয়েছি। আমাদের সভাপতিও বিবাহিত। লজ্জা লাগে। বিষয়টা দায়িত্বশীলরা বোঝে না।’
দীর্ঘ ১০ বছর সম্মেলন না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে কমিটি না হওয়া চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের স্টাইল। মনে হয়, মহানগর আওয়ামী লীগের আগে ছাত্রলীগের সম্মেলন হবে না।’
নগরীতে ছাত্রলীগের তৎপরতা না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ হলো ক্রান্তিলগ্নের সংগঠন। দেশে এখন ক্রান্তি নেই, তাই ছাত্রলীগের কার্যক্রমও নেই।’
২০১৩ সালে কমিটি হওয়ার পর প্রকাশ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে নগর ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ। এক পক্ষের নেতাকর্মীরা হলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী, আর অপর পক্ষের নেতাকর্মীরা হলেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন ২০১৫ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে সংবর্ধনা দেওয়া দিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সৃষ্টি হয়।
পাঁচ বছর আগে ২০১৮ সালের ২৭ মে নগরীর জামাল খান রীমা কনভেনশন সেন্টারে নগর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বিরোধের আগুন নিভে গিয়েছিল। সেই আগুন নিভিয়েছিলেন নগর ছাত্রলীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। তিনি আ জ ম নাছিরের সমর্থক ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে টেনে নিয়ে একসাথে ইফতার মাহফিল করেন। কিন্তু এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে আবার দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
গত এক বছর ধরে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনটির দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
জানা গেছে, গত এক বছরে ৩৩টি ইউনিট কমিটি গঠন করেছে নগর ছাত্রলীগ। এর মধ্যে থানা কমিটি ১৩টি, ওয়ার্ড কমিটি ১২টি এবং কলেজ কমিটি ৮টি। ওই সময় এসব কমিটিকে ‘মাই ম্যান’ কমিটি আখ্যা দিয়ে কয়েকটি ইউনিটে পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন নগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি মিথুন মল্লিক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদ রাসেল। তারা নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাদের বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।
২০১৩ সাল থেকে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের দ্বিধাবিভক্তি কেবল মহানগর কমিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পাল্টাপাল্টি ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখন ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূলে।