চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে নজর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের
এনসিটি, পিসিটি, গভীর সমুদ্র বন্দর ও বে-টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। বিশ্বের বড় বড় বন্দরগুলোর আদলে সাজানো হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক চাহিদা বিবেচনা করে বাড়ানো হচ্ছে বন্দরের সক্ষমতা। আর এসব কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনায় নজর পড়েছে অনেকের। পিছিয়ে নেই বিদেশিরাও। বিনিয়োগে আগ্রহী বিশে^র নামীদামী কোম্পানিগুলো। উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবসা কবজা করা।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, বিশ্বের নামকরা পোর্ট মালিক, অপারেটর এবং কন্টেইনার ও শিপিং কোম্পানিগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহী। সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিএসএ, দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড, সৌদি আরবের রেড সি, ড্যানিশ কনটেইনার শিপিং সংস্থা-মার্কসলাইন, ফরাসী শিপিং সংস্থা সিএমএ-সিজিএমসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্র বন্দর ও বে-টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দর ঘুরে গেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর প্রশাসন, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিদেশের এসব বন্দর মালিকের টাকায় নানা বন্দর ঘুরে এসেছেন। বিশ্বের এসব নামিদামী প্রষ্ঠিানগুলো স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবসা কবজা করার জন্য তদবির চালাচ্ছেন বলে জানা যায়।
পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) নির্মাণ কাজ কয়েক দফা পিছিয়ে গত বছর শেষ হয়েছে। পিসিটি বাণিজ্যিক পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হলেও এখনও চূড়ান্ত হয়নি অপারেটর। বাংলাদেশের একটি নেতৃস্থানীয় শিল্পগ্রুপ পিসিটি পরিচালনায় আগ্রহী। তবে সৌদি রেড সি রয়েছে আলোচনার অগ্রভাগে। এদের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর আওতায় আইএফসি নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আইএফসি প্রণীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে ‘বিজনেস মডিউল’ তৈরি হবে বলে বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, বিদেশি অপারেটর কর্তৃক পিসিটি পরিচালনা, পণ্য উঠানামাসহ সংশ্লিষ্ট কাজের ট্যারিফ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে। জাহাজের বার্থিং নির্ধারিত হবে বন্দরের নীতিমালা অনুযায়ী। পিসিটি পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিনিয়োগ তথা ইকুইপমেন্ট স্থাপন না করা পর্যন্ত এক ধরনের পদ্ধতি এবং বিদেশি কোম্পানি কর্তৃক ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হলে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। বিষয়টি ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার আইএফসিকে জানিয়েছে বন্দর প্রশাসন।
চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করে গেছেন সিএমএ-সিজিএম-এর একটি প্রতিনিধি দল। চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা চট্টগ্রাম বন্দর ও গভীর সমুদ্র বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পরিদর্শক দল বন্দর প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে বলেছেন, তাদেরকে কনটেইনার সংখ্যার নিশ্চয়তা দিতে হবে না। বরং তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক কনটেইনারের নিশ্চয়তা দেবে। তারা কোনো প্রকার ট্রান্সশিপমেন্ট ছাড়াই সরাসরি কনটেইনার পরিবহন করবে। একইভাবে মার্কসলাইন বে-টার্মিনাল, গভীর সমুদ্র বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। তারা চট্টগ্রাম বন্দরের চাপিয়ে দেওয়া যে কোনো শর্ত মেনে ব্যবসা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পিপিপি মডেলের আওতায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এ সংক্রান্ত প্রস্তাব একনেকের অনুমোদন লাভ করেছে। পিসিটির মতো এ প্রকল্পেও ‘ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার’ নিয়োগের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড ‘জি টু জি’ চুক্তির আওতায় এনসিটির কাজ পেতে প্রস্তাব দিয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এনসিটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সাইফ পাওয়ার টেক নামীয় দেশিয় অপারেটর পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে দেশিয় এ প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের কর্তৃক নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গভীর সমুদ্র বন্দরও কে পরিচালনা করবে তা নিয়ে এখন থেকে তোড়জোর শুরু হয়ে গেছে। নজর পড়েছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর।
চট্টগ্রাম বন্দরের মেগা প্রকল্প বে-টার্মিনাল। পতেঙ্গা সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ব্রেক ওয়াটার বাঁধ এবং ড্রেজিংয়ে কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বে-টার্মিনালের থাকছে তিনটি টার্মিনাল। এরমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থায়নে একটি মাল্টিপারপাস বার্থ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া আরও দুটি টাার্মনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে। মাল্টিপারপাস বার্থসহ পুরো প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। বিদেশি কোন দুটি প্রতিষ্ঠান অপর দুই টার্মিনালের কাজ পাবে তা শিগগির জানা যাবে। এই দুটি টার্মিনাল নির্মাণেও বিদেশি কোম্পানিগুলোর কমতি নেই। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চালিয়ে যাচ্ছে দেন-দরবার। তবে দুটি টার্মিনাল পিপিপি পদ্ধতিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দুবাই পোর্ট বে টার্মিনালের মাল্টিপারপাস বার্থ চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে যৌথ অর্থায়নে নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর নীতিমালায় যৌথভাবে বন্দর নির্মাণের সুযোগ না থাকায় দুবাই পোর্ট মাল্টিপারপাস বার্থে ভাগ বসাতে পারছে না। বিষয়টি তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বে-টার্মিনালসহ চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহ সম্পর্কে আলাপকালে বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যদি বিদেশিদের দিতে হয় সেক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি নেই। এক্ষেত্রে আমাদের স্বার্থগুলো পুঙ্খাানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি, সিংগাপুর কিংবা হংকং বানানোর পক্ষে আমরা নই। বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের সাথে যাতে তাল মিলিয়ে চলতে পারে সেভাবে চট্টগ্রাম বন্দরকে গড়ে তুলতে হবে। দেশের স্বার্থ রক্ষা না করে, টোটাল ইনকামটা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে আমরা নই। বিদেশিদের দিতে হলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আমাদের কাজ করতে হবে।