চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং রুখতে মাঠে র‌্যাব

চট্টগ্রামে ‘কিশোর গ্যাং’ একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিশেষ করে আধিপত্য নিয়ে বিরোধে প্রায়ই চট্টগ্রামের কোথাও না কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে অপরাধে জড়িয়ে পড়া এই কিশোররা। নগরীর কয়েকটি এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ে নীতিমত আতঙ্কিত। জানা যায়, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, চকবাজার, পাঁচলাইশ, খুলশী, বায়েজিদ, পাহাড়তলী, হালিশহর, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের দৌরাত্ম রয়েছে। সিএমপির তথ্যমতে, নগরীতে ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয়, যার সদস্য সংখ্যা ১৪০০ জনেরও বেশি। ফলে সারা দেশের ন্যায় চট্টগ্রাম নগরীতেও এখন কিশোর গ্যাংগুলো মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার কিশোর গ্যাং রুখতে মাঠে নেমে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গত ১ মাসে ১২ গ্রুপের প্রধানসহ গ্রেফতার হয় ৬১ জন। কিশোর গ্যাং রুখতে র‌্যাব তৎপর ও অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানান র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম। এদিকে কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি মদতদাতা এবং আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরী বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাক চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।
সর্বশেষ গত বুধবার দিবাগত রাতে চাঁদাবাজি এবং ছিনতাইরোধে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬ কিশোর গ্যাং গ্রুপের ৩৩ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব-৭)। এ সময় তাদের কাছ থেকে অনেক দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ফরেস্ট গেইট রেলক্রসিং এলাকার রুবেল গ্রুপের প্রধানসহ নামে ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা পথচারীদের স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ এবং মোবাইল-ফোন ছিনতাই করতো। ওইদিন নগরীর বায়েজিদ থানার পুর্ব নাসিরাবাদ এলাকার জনি গ্রুপের প্রধান জনিসহ ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা ছিনতাই আর ডাকাতি করে বেড়ায়, এতে বাধা দিলেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলে পড়ে পথচারীদের ওপর। এরপর নগরীর পাঁচলাইশ থানার মোহাম্মদপুরের এয়ার বিল টাওয়ার এলাকার বাচা গ্রুপের প্রধান বাচা মিয়া ওরফে বাচা সোহেলসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা দেশীয় অস্ত্রসহ এক জায়গায় জড়ো হয়ে করেন প্লান করে করতো চুরি, ছিনতাই আর ডাকাতি। এরপরই নগরীর পাহাড়তলী এলাকার সাজ্জাদ গ্রুপের প্রধান সাজ্জাদসহ ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা প্রতিদিন ১২ কোয়ার্টার এলাকা দিয়ে চলাচল করা পোশাক শ্রমিক, সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নিত। ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ডাকাতিতেও তারা সক্রিয় বলে জানিয়েছে র‌্যাব। একইদিন নগরীর পাহাড়তলী থানার সরাইপাড়া এলাকার সাকিব গ্রুপের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা ওই এলাকার সাধারণ মানুষসহ রাস্তায় চলাচলকারী পথচারী, পোশাক শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ নিরীহ মানুষদের টার্গেট করে সব লুটে নেয়। এছাড়া নগরীর ডবলমুরিং থানার সরাইপাড়া এলাকার বিপুল গ্রুপের প্রধান বিপুলসহ ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তারা ওই এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ডাকাতি করে বেড়ায়।
গত মাসের ২৮ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের প্রধানসহ ২৫ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকা থেকে নুরু গ্রুপের সদস্য রাকিব উদ্দিন তামিমসহ ৬ জনকে, আমিন কলোনি এলাকা থেকে রশিদ গ্রুপের প্রধান হারুনুুর রশিদ, আকবর টিলা পূর্বাঞ্চল হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে রুবেল গ্রুপের প্রধান রবিউল আওয়াল রুবেলসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বাকলিয়া থানার এক্সেস রোড এলাকা থেকে ইউসুফ গ্রুপের প্রধান ইউসুুফসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পাহাড়তলীর সাগরিকা মোড় এলাকা থেকে সাদ্দাম গ্রুপের প্রধান রকিবুল হোসেন ওরফে সাদ্দামসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হল- রাকিব উদ্দিন তামিম (১৯), আহাদ আলীফ (১৯), গোপাল ত্রিপুরা (২২), আবরার হান্নান (১৯), জুবাইরুল ইসলাম (২০), সুব্রত বড়ুয়া (২১), হারুনুর রশিদ (২১), রবিউল আওয়াল রুবেল (২৩), মুন্না (২২), মেহেদী হাসান মুন্না (২০),  মনির (২০), ফারহাদ (২৪), আসিফ (২২), রাশেদ ওরফে রাসেল (২০), ইউসুফ (২১), এমরান হোসেন বাবলু (২৩), জামাল উদ্দিন (৩৮), সাখাওয়াত হোসেন শাকিল (২৪), মনির উদ্দিন (২৫), রকিবুল হোসেন ওরফে সাদ্দাম (২৬), সাব্বির হোসেন (২০), আলা উদ্দিন (২০), মাসুদুুর রহমান অপু (২৬), রায়হান (২২) ও জাকির হোসেন (৩০)। একই দিন চট্টগ্রামের বাইরে ফেনী থেকে থেকে এসডিকে গ্রুপের প্রধান রাব্বিসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাব্বি (২০), তৌহিদুল ওরফে সাগর (১৭), ফখরুলকে (২০), গ্রেফতার করে র‌্যাব।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী গতকাল শুক্রবার দুপুরে দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, অপরাধে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনায় র‌্যাবকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এই কিশোরদের মদদদাতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয়কারীদেরও চিহ্নিত করে আইনের আনতে হবে। নয়তে গাছের আগা কেটে গোড়ায় পানি ঢালার মতো হবে। তাই কিশোর গ্যাং গঠনের সাথে যারাই সংশ্লিষ্ট তাদের দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে শাস্তির আওতায় আনতে পারলে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ কিংবা নির্মূল সম্ভব।
র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম বলেন, অন্যান্য জেলার মতো চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় কিশোর গ্যাং এর আধিপত্য রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোররা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। অধিকাংশ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় এলাকার একটি চক্রের মদদ রয়েছে। হিরোইজম প্রকাশ করতেও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ। ইতোমধ্যে নানা অনিয়ম ও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে এদের মধ্যে অনেককেই গ্রেফতার করেছি। বাকি কিশোর গ্যাংয়ের ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে। অপরাধের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কেউ ছাড় পাবে না।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব শপিং সেন্টারে আমাদের গোয়েন্দা দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া ট্রেন ও বাস স্টেশনগুলো থেকে যাত্রীরা যেন তাদের ভ্রমণ নিরাপদে করতে পারে সেই নিরাপত্তা র‌্যাব দেবে। ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো কিশোর গ্যাং গ্রুপের অপতৎপরতা রুখতে সর্তক রয়েছে এবং  কিশোরর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।